
তেহরানের আকাশে এখন থমথমে নীরবতা। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে সশস্ত্র বাহিনী। দূতাবাসগুলো একে একে খালি হচ্ছে। পশ্চিমা নাগরিকরা তড়িঘড়ি করে দেশ ছাড়ছেন। গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি খুব কমই দেখা গেছে। যা কিছু ঘটছে তার প্রতিটি মুহূর্ত বলে দিচ্ছে যে সামনে আসছে এমন কিছু যা হয়তো পুরো বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রকেই বদলে দিতে পারে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের অভ্যন্তরে যে ঘটনা প্রবাহ দেখা গেছে তা সাধারণ চোখে দেখলে মনে হতে পারে একটি সাধারণ অর্থনৈতিক সংস্কার আন্দোলন। কিন্তু এই আন্দোলনের পেছনে যে গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো ছিল সেটা এখন ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দাবি করছে যে এই তথাকথিত আন্দোলনের পেছনে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরাইলের মুসাদ জড়িত ছিল। তারা চেয়েছিল ভেতর থেকে ইরানকে দুর্বল করে দিতে।
ইরান সরকার প্রথমদিকে এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করেনি। তারা একটি কৌশলী অবস্থান নিয়েছিল। তেহরানের উচ্চপদস্থ সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে এটা ছিল একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনার অংশ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি চেয়েছিলেন দেশের জনগণের সামনে এই আন্দোলনের প্রকৃত স্বরূপটা উন্মোচিত হোক। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ নিজেরাই বুঝুক যে এই তথাকথিত সংস্কার আন্দোলনের পেছনে আসলে কারা এবং তাদের উদ্দেশ্য কী।
এই কৌশল কাজে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। গত কয়েকদিনে ইরানের বিভিন্ন শহরে যে দৃশ্য দেখা গেছে তা সত্যিই অভূতপূর্ব। তেহরান থেকে শুরু করে ইসফাহান, মাশহাদ, শিরাজ এবং তাব্রিজ সব জায়গায় লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। তবে এবার তারা সরকারের বিপক্ষে নয়, সরকারের পক্ষে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সমর্থনে এবং আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করতে তারা একজোট হয়েছে।
এই জনসমুদ্রের দৃশ্য দেখে যে কেউ অবাক হবে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এই সমাবেশে যোগ দিয়েছে। তাদের হাতে ইরানের জাতীয় পতাকা। তাদের মুখে একটাই স্লোগান যে আমেরিকা মুর্দাবাদ এবং ইসলামিক শাসন কায়েম থাক। এই বিশাল জনসমর্থন দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন স্বয়ং আয়াতুল্লাহ খামেনি। তিনি জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছেন যে এই ধরনের সংকটময় মুহূর্তে দেশের সকল নাগরিককে একত্রিত থাকতে হবে। শত্রুর মোকাবেলায় মুষ্টিবদ্ধ হাতে দাঁড়াতে হবে।
আয়াতুল্লাহ খামেনির এই বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি দেশের স্বার্থের বাইরে কোনো কাজ করবেন না। যা কিছুই হোক না কেন দেশের স্বার্থে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এই ঘোষণা ইরানের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে।
এই ঘোষণার পরপরই ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিশেষ করে বাসিজ বাহিনী পূর্ণ শক্তিতে মাঠে নেমেছে। তারা আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে তথাকথিত আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এটাকে ক্র্যাকডাউন বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে প্রচার করছে। তারা এমনটাই বলবে এটা ধারণা করাই যায়।
তবে মজার বিষয় হলো আন্তর্জাতিক বড় বড় সংবাদ মাধ্যম যেমন আল জাজিরা এবং বিবিসি নিজেরাই স্বীকার করছে যে ইরানের এই শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া কাজ করেছে। তারা জানাচ্ছে যে ইরানের অভ্যন্তরে যে আন্দোলন ছিল তার প্রায় সত্তর থেকে আশি শতাংশ এখন নিয়ন্ত্রণে। পশ্চিমা বিশ্ব যে উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন দেখেছিল ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে বা দেশটি ভেঙে পড়বে সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হচ্ছে আসল উত্তেজনা।
যুক্তরাষ্ট্র কখনোই সহজে হার মানতে রাজি নয়। তাদের বিশ্ব আধিপত্যের যে কৌশল তাতে ব্যর্থতার কোনো জায়গা নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বজায় রাখতে তারা যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনা এর একটি উদাহরণ। যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন একজন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টকে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো ইরানের ক্ষেত্রে তারা কী করতে যাচ্ছে। ভেতর থেকে ইরানকে দুর্বল করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি সামরিক হামলার কথা ভাবছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই খবর শুধু গুজব নয়। এর পেছনে কিছু শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে যা দেখে রীতিমতো শিহরিত হতে হয়।
গত কয়েক ঘণ্টায় যা ঘটছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার মিত্র দেশগুলোকে একটি বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। এই বার্তা পাওয়ার পরপরই পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। আগামী চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ইরান ত্যাগ করতে বলা হয়েছে।
এই নির্দেশের গুরুত্ব বুঝতে হলে একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। এর আগেও ইরানে ছোটখাটো সংঘাত হয়েছে। ইসরাইল হামলা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিয়েছে। কিন্তু কখনোই এই সকল দেশের নাগরিক বা দূতাবাস কর্মীদের দেশ ছাড়তে বলা হয়নি। কারণ সবাই জানত যে কোনো সংঘাত হলেও সেটা সীমিত পরিসরে থাকবে।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউরোপীয় দেশগুলো একে একে তাদের দূতাবাস খালি করছে। অস্ট্রেলিয়া জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় দেশগুলোও তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনছে। এত বড় পরিসরে এই ধরনের পদক্ষেপ একটাই কথা বলছে যে সামনে বড় কিছু হতে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের পরিকল্পনা করছে। এটা কোনো ছোটখাটো বিমান হামলা নয়। ব্যাপক ভিত্তিতে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে ঘোষণা দিয়েছেন যে এখন শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময় এসে গেছে। এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে একটি হুমকি।
তবে এখানে একটি কৌশলগত দিক রয়েছে যা বোঝা দরকার। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে প্রথম হামলাটা যুক্তরাষ্ট্র নিজে করবে না। প্রথম আঘাতটা আসবে ইসরাইল থেকে। এর পেছনে একটি কূটনৈতিক কারণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে প্রথম দফায় নিজেকে সরাসরি জড়িত না রাখতে। তারা বলতে পারবে যে এটা ইসরাইলের একক সিদ্ধান্ত এবং আমরা সহযোগী নই।
এই কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র তার মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলোকে প্রাথমিক পাল্টা হামলা থেকে রক্ষা করতে চায়। ইরান যদি পাল্টা হামলা করে তাহলে সেই হামলা প্রথমে ইসরাইলের দিকে যাবে। তারপর পরিস্থিতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র মাঠে নামবে।
এই মুহূর্তে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যে সামরিক সমাবেশ চলছে তা দেখলে বোঝা যায় কত বড় পরিসরে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তার বিপুল পরিমাণ বিমান শক্তি এবং পদাতিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়ন করেছে। ইরানকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার জন্য কৌশলগত অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো কুয়েতে যে অস্ত্র মোতায়ন করা হয়েছে। এই ছোট্ট দেশটিতে এবার অস্বাভাবিক পরিমাণ অস্ত্র এসেছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর খবর হলো ইসরাইলি প্রযুক্তিতে তৈরি কাউন্টার লেজার ড্রোন সিস্টেম কুয়েতে মোতায়ন করা হয়েছে। এই অত্যাধুনিক লেজার অস্ত্র ইরানের বিভিন্ন ধরনের আক্রমণকারী ড্রোনকে প্রতিহত করতে সক্ষম।
এখানে একটি মজার বিষয় রয়েছে। কুয়েত আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয় না। ইসরাইলের সঙ্গে তাদের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তাহলে ইসরাইলি অস্ত্র কীভাবে কুয়েতে এলো। এর উত্তর খুবই সহজ। যুক্তরাষ্ট্র এই অস্ত্রগুলোতে মেইড ইন ইউএসএ লেবেল লাগিয়ে দিয়েছে। তারা দাবি করছে এগুলো বোয়িং এবং লকহিড মার্টিন কোম্পানি যৌথভাবে তৈরি করেছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা জানেন এগুলো আসলে ইসরাইলি প্রযুক্তিতে তৈরি।
কুয়েত এই পরিস্থিতিতে কিছুই করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করছে এবং তারা বাধা দিতে সাহস পাচ্ছে না। এটাই হলো বাস্তবতা।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল পরিকল্পনাটা এখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। পারস্য উপসাগরে যে আরব দেশগুলো রয়েছে তাদের একটি প্রতিরক্ষা লাইন হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ওমান থেকে শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরাত তারপর সৌদি আরব কুয়েত কাতার এবং বাহরাইন এই পুরো অঞ্চল জুড়ে ব্যাপক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়ন করা হচ্ছে।
উদ্দেশ্য একটাই। ইরান যখন ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ঘাঁটিতে হামলা করবে তখন প্রথম দফায় এই দেশগুলো থেকে সেই আক্রমণ প্রতিহত করা হবে। এটা হবে ফার্স্ট লাইন অফ ডিফেন্স। এই কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই অঞ্চলে নিয়ে আসছে।
এখন একটি বড় প্রশ্ন হলো এই আরব দেশগুলো কেন যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনায় সামিল হচ্ছে। মাত্র কিছুদিন আগেও এই দেশগুলো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল যে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে তারা তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না। তাহলে এত দ্রুত তাদের অবস্থান বদলে গেল কেন।
উত্তরটা লুকিয়ে আছে ভেনেজুয়েলার ঘটনায়। যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করার চেষ্টা করেছে তা এই আরব দেশগুলোর শাসকদের মনে গভীর ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। তারা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গেলে তাদের আমির বা বাদশাহকেও উৎখাত করা হতে পারে। এই ভয়েই তারা যুক্তরাষ্ট্রের সব নির্দেশ মেনে নিচ্ছে।
ফলে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে এই আরব দেশগুলো সরাসরি জড়িয়ে পড়বে। তারা হয়তো নিজেরা হামলা করবে না কিন্তু তাদের ভূখণ্ড এবং আকাশসীমা ব্যবহার করা হবে।
এই মুহূর্তে পুরো মধ্যপ্রাচ্য একটি টাইম বোমার উপর বসে আছে। পাল্টাপাল্টি প্রস্তুতি চলছে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে। উভয় পক্ষই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ইরান একদিকে তার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সামলাচ্ছে অন্যদিকে বাইরের হুমকি মোকাবেলার জন্যও তৈরি হচ্ছে।
এখন দেখার বিষয় ইরান এই সার্বিক জটিল পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করে। যুক্তরাষ্ট্র কতটা শক্তিশালী হামলা করে। আর এই যুদ্ধ যদি সত্যিই শুরু হয় তাহলে পুরো বিশ্বে এর প্রভাব কী হবে। তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। বিশ্ব অর্থনীতি টলে যাবে। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বিপন্ন হবে।
পরিস্থিতি এখন সত্যিই উদ্বেগজনক। প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। বিশ্ববাসী এখন উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা দেখার জন্য।
