
একদিকে নদীভাঙনের ভয়াবহ থাবা, অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে বাজার রক্ষার সরকারি প্রকল্প। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্প আলোর মুখ দেখার আগেই ফের মনু নদীর ভাঙনে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার শতবর্ষী কাউকাপন বাজার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকায় বাজারের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ভাঙন ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শুধু কয়েকটি দোকান নয়, পুরো কাউকাপন বাজার এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় কাউকাপন বাজারের ৩৬টি দোকান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর বাজার ও আশপাশের এলাকা রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০২০ সালে কাউকাপন বাজারসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রায় ৪৫০ মিটার কাজের জন্য টেন্ডারও হয়। কিন্তু দীর্ঘ ছয় বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি।
কাউকাপন বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বিধান চন্দ্র দে বলেন, একসময় বাজারটিতে শতাধিক দোকানপাট ছিল। বর্তমানে দোকান রয়েছে প্রায় ৬৫টি। ২০১৮ সালের বন্যার পর বাজারের মাঝখানে ভাঙন দেখা দেয়। সাম্প্রতিক বন্যায় ওই ভাঙনস্থলে মাটি আরও পাঁচ থেকে ছয় ফুট দেবে গেছে। ফলে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ভাঙনস্থল দিয়ে কাউকাপন গ্রামের শত শত শিক্ষার্থী প্রতিদিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। সড়কটি আরও ভেঙে গেলে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। বাজারের সঙ্গে আশপাশের এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আল-আমিন জানান, ২০২০ সালে কাউকাপন বাজারসহ এলাকায় ৪৫০ মিটার কাজের জন্য টেন্ডার হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় তিন বছর প্রকল্প এলাকায় মাটির নিচে ৪৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করে।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, তিনি সরেজমিনে ক্ষতিগ্রস্ত কাউকাপন বাজার এলাকা পরিদর্শন করে কাজ দ্রুত শুরু করার বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনা করবেন।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, সম্প্রতি তিনি কাউকাপন বাজারের ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পরিদর্শন করেছেন। বাজার রক্ষায় ইতোমধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে প্রায় তিন বছর আগে স্থানীয়রা কাজের প্রয়োজনীয়তা নেই মর্মে লিখিত আবেদন করার পর কাজ বন্ধ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জমি অধিগ্রহণের সুযোগ নেই। বাজারের জমির প্রকৃত মালিকরা অধিগ্রহণ ছাড়া কাজ করতে দেবেন—এ মর্মে লিখিত আবেদন করলে পুনরায় কাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর দাবি, অতীতে স্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে কাজটি শেষ করা গেলে বর্তমানে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—সরকারি অর্থে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে কেন? আর প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকার মধ্যে নদীভাঙনে বাজার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে এত দীর্ঘ সময় লাগছে কেন?
কাউকাপন বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাদের দাবি, বিষয়টি কাগজপত্র ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জরুরি ভিত্তিতে সরেজমিন পরিদর্শন করে ভাঙন প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে একসময় নদীভাঙনের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু প্রকল্প নয়, কুলাউড়ার ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী কাউকাপন বাজারটিকেই রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
