
মস্কোর আকাশে সেদিন মেঘ জমেছিল। বৃহস্পতিবার বিকেলে ক্রেমলিনের সেই সুউচ্চ দেয়ালের ভেতরে যা ঘটেছিল, তা পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরে লেখা থাকবে। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর একটি এইভাবে নতজানু হবে। কেউ ভাবেনি যে, যেই ভ্লাদিমির পুতিন একসময় পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন, সেই পুতিন একদিন এভাবে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করবেন। কিন্তু বাস্তবতা কখনো কখনো কল্পনার চেয়েও নিষ্ঠুর হয়। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে যা বলে, কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না। এই প্রবাদটি যেন রাশিয়ার জন্যই তৈরি হয়েছিল।
গত কয়েক দিনে যা ঘটে গেল, তা শুধু রাশিয়ার জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বব্যবস্থার জন্য একটি অশনি সংকেত। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা আগেও কেউ জানত না যে ইতিহাস এইভাবে বাঁক নেবে। মিস্টার পুতিনের ব্যক্তিগত অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধি মিস্টার উইটকফ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা, যিনি নিজে একজন ইহুদি, তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করতে রাজি হয়েছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট। সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠক মস্কোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তার পরিণতি যা হয়েছে তা রীতিমতো হতবাক করে দেওয়ার মতো।
বৈঠকের কিছু ছবি প্রকাশিত হয়েছে। সেই ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে ট্রাম্পের জামাতা, যাকে অনেকেই ইসরাইলের সরাসরি এজেন্ট হিসেবে বর্ণনা করেন, তিনি সরাসরি পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। এই দৃশ্য কয়েক বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু আজ এটি বাস্তব এবং এই বাস্তবতা পুরো বিশ্বের ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করছে।
এই বৈঠক কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে হলে একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও মিস্টার পুতিন তার বক্তব্যে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছিলেন। গ্রীনল্যান্ড ইস্যুতে তিনি বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই গ্রীনল্যান্ড দখলের প্রচেষ্টা হলো বিশ্ব শাসনব্যবস্থার উপর সরাসরি গুন্ডামি। তিনি বলেছিলেন এটি আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এই ধরনের আগ্রাসী মনোভাব বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি। সেই কথাগুলো তিনি বলেছিলেন মাত্র কয়েকদিন আগে। কিন্তু এই বৈঠকের পর যা ঘটল তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য।
বৈঠক শেষ হওয়ার পরপরই মিস্টার পুতিন তার আগের সমস্ত বক্তব্য থেকে সম্পূর্ণ ঘুরে গেলেন। একেবারে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেলেন। তিনি এখন বলছেন, গ্রীনল্যান্ড কার হাতে থাকবে সেটা তাদের বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকবে নাকি স্বাধীন থাকবে, এই ব্যাপারে রাশিয়ার কোনো আগ্রহ নেই। এটি তাদের বিজনেস নয়। শুধু তাই নয়, তিনি আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে বললেন যে গ্রীনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র মাত্র এক বিলিয়ন ডলার দিয়ে ক্রয় করতে পারে এবং এর বেশি দাম এটার হতে পারে না।
কিন্তু সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং একই সঙ্গে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মিস্টার পুতিন সরাসরি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যদি গ্রীনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র দখল করে, তাহলে এই গ্রীনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে প্রথম দেশ হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে। এই ঘোষণা শুনে সামরিক বিশেষজ্ঞরা হতবাক হয়ে গেছেন। এটি কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। এটি একটি বড় ধরনের সমঝোতা এবং কোর ইন্টারেস্টের প্রশ্ন।
যে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধ করছে বলে তারা দাবি করে, সেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মিস্টার পুতিনের এই হঠাৎ বদলে যাওয়া অবস্থান অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাশিয়া বলে আসছিল তারা অস্তিত্বের সংকটে লড়াই করছে। তারা বলছিল ন্যাটোর সম্প্রসারণ তাদের জন্য মরণব্যাধি। তারা বলছিল ইউক্রেনে তাদের উপস্থিতি আত্মরক্ষামূলক। কিন্তু সেই রাশিয়াই এখন গ্রীনল্যান্ড দখলে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এই বৈপরীত্য কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।
সামরিক বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মিস্টার পুতিন এবং তার দেশের সামরিক সক্ষমতা ও পাওয়ার যা দাবি করা হয়ে থাকে, এই সকল পদক্ষেপ তার দেউলিয়াত্ব প্রকাশ করছে। রাশিয়া যে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বপর্যায়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে, এই বৈঠক এবং তার পরবর্তী ঘোষণাগুলো তা প্রমাণ করে।
একের পর এক রাশিয়ার জাহাজ এবং তেলের ট্যাংকার ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজে সাতটি ধরে নিয়ে গেছে। ফ্রান্সের মতো দেশ এবং ইউরোপের বাকি দেশগুলোও কয়েকটি করে ধরে নিয়ে গেছে। রাশিয়া চাইলে এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তার বিশাল সামরিক বহর ব্যবহার করতে পারত। তারা চাইলে সরাসরি একশনে যেতে পারত। কিন্তু রাশিয়া সেখানে কোনোভাবেই যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে রাশিয়া যেন ভয় পেয়ে গেছে। অথবা তাদের সামরিক শক্তি যতটা বলা হয় ততটা নেই। অথবা অভ্যন্তরীণ কোনো সংকট আছে যা তাদের এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে।
আরো দুঃখজনক এবং নজিরবিহীন একটি ঘটনা ঘটেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন বোর্ড তৈরি করতে চাইছে যার নাম দেওয়া হয়েছে গাজা বোর্ড অফ পিস। এই বোর্ড হবে মূলত জাতিসংঘের বিকল্প একটি নিরাপত্তা পরিষদ। এখানে ভেটো পাওয়ার পেতে হলে প্রতিটি দেশকে এক বিলিয়ন ডলার অনুদান দিতে হবে। এটি একটি অভূতপূর্ব প্রস্তাব যা আন্তর্জাতিক আইন এবং বিশ্বব্যবস্থার মূল ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে চীন। ইউরোপের দেশগুলোও এর বিরোধিতা করছে। পৃথিবীর অনেক দেশই এই প্রস্তাবকে একতরফা এবং আগ্রাসী বলে বর্ণনা করেছে। কিন্তু রাশিয়া? রাশিয়া কী করল? রাশিয়া প্রথম দেশ হিসেবে এই গাজা বোর্ড অফ পিস এ যুক্তরাষ্ট্রকে অনুদান দিতে যাচ্ছে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। যে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বলে দাবি করে, সেই রাশিয়াই এখন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুদান দিচ্ছে।
মিস্টার পুতিন সম্প্রতি তার বক্তব্যে নিশ্চিত করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে জব্দ থাকা রাশিয়ার যে অর্থ রয়েছে, সেখান থেকে এক বিলিয়ন ডলার ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই গাজা পিস বোর্ড এ তিনি অনুদান করতে যাচ্ছেন। এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সেই বোর্ডে তিনি যোগদান করতে যাচ্ছেন। এটি একটি নজিরবিহীন পরাজয়। এটি একটি ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ।
দেখুন যুক্তরাষ্ট্র যা চাইছিল তা পাচ্ছে। তাদের নেতৃত্বে বিশ্ব চলবে এই স্বপ্ন তারা বাস্তবায়ন করছে। ট্রাম্প নিজে ঘোষণা করেছেন যে এই বোর্ডের আজীবন প্রেসিডেন্ট তিনি নিজে। তিনি যে কোনো মুহূর্তে এই বোর্ডের নিয়ম পরিবর্তন করতে পারবেন। তার কথার বাইরে কোনো কিছু ঘটতে পারবে না। যে দেশগুলো এখানে ভেটো পাওয়ার চাইবে তাদের এক বিলিয়ন ডলার দিয়ে সদস্যপদ নিতে হবে। এবং রাশিয়া এই শর্ত মেনে নিয়েছে।
চীন এই পুরো পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। চীনের বক্তব্য হলো এই ধরনের পদক্ষেপ পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে আরো জটিল সমীকরণে নিয়ে যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, জাতিসংঘ যে নিরাপত্তা পরিষদ তৈরি করেছিল, সেই সবকিছু এখন হুমকির মুখে। এবং রাশিয়া এই ধ্বংসযজ্ঞে সরাসরি সহযোগিতা করছে।
রাশিয়া যখন ট্রাম্পের নেতৃত্ব মেনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই গাজা শান্তি বোর্ড বা নিরাপত্তা পরিষদের বিকল্প পরিষদে যোগদান করল, তার পরপরই মুসলিম বিশ্বের আটটি প্রভাবশালী দেশও এই বোর্ডে যোগদান করেছে। সৌদি আরব, মিশর সহ যে দেশগুলো রয়েছে তাদের জোট এখন এই গাজা পরিষদে অংশ নিচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে যা জানা যাচ্ছে তা হলো এই গাজা পরিষদের ভেটো পাওয়ার ক্রয় করার জন্য এই আটটি মুসলিম দেশ এক বিলিয়ন ডলার করে মোট আট বিলিয়ন ডলার খরচ করবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো নিশ্চয়তা দেননি যে এই অর্থগুলো তিনি কোথায় ব্যয় করবেন। তিনি তার ব্যক্তিগত ফান্ডে এটা রেখে দেবেন কিনা, বা গাজা উপত্যকা গঠনের পরিবর্তে এটা ইসরাইলকে সামরিক সাহায্যে ব্যবহার করা হবে কিনা, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কিন্তু তারপরও দেশগুলো এই বোর্ডে যোগ দিচ্ছে। কেন? কারণ রাশিয়া পথ দেখিয়েছে। রাশিয়া প্রথম আত্মসমর্পণ করেছে। এবং বাকিরা তার পথ অনুসরণ করছে।
সার্বিক পরিস্থিতি যখন এই অবস্থায়, তখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে ইরান। এবং তাদের এই সতর্কতার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। দেখুন ইসরাইলের এজেন্ট হিসেবে পরিচিত ট্রাম্পের জামাতা, যিনি নিজে ইহুদি, তার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তার পরপরই রাশিয়া বিভিন্ন ধরনের নেগোসিয়েশন এবং বক্তব্য দিচ্ছে। গ্রীনল্যান্ড দখলকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন করা হচ্ছে। গাজা পরিষদে হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে রাশিয়ার অংশগ্রহণ হচ্ছে। এক বিলিয়ন ডলার অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা এবং ইরানি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছেন যে, ইরানকে কেন্দ্র করেও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের সমঝোতা করেছে। এই সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী, যদি ইরানে সরাসরি আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র ইসরাইল, তাহলে রাশিয়া তার লজিস্টিক সাপোর্টের যে সাপ্লাই ইরানে চলমান রয়েছে সেটা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেবে অথবা সীমিত করে দেবে। আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতাও হয়েছে।
এছাড়াও চাপ প্রয়োগের বিষয়ও রয়েছে এখানে। ইরানের অভ্যন্তরে তাদের যে পরমাণু কর্মসূচি রয়েছে, সেখানে বড় ধরনের বাধাবিঘ্ন তৈরি করতে যাচ্ছে রাশিয়া। এবং ইসরাইলের ইহুদি নেতৃত্ব এবং ট্রাম্পের জামাতা, যিনি নিজেও ইহুদি, তিনি এই বৈঠকের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সুতরাং ইরানের এই চিন্তা করা যে চূড়ান্ত ক্ষতিকর পরিস্থিতি বা বিপদে রাশিয়া পাশে থাকবে না, এই আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
রাশিয়ার মুভমেন্ট দেখলে বোঝা যায় তারা হঠাৎ করে এই ধরনের ছাড় দিচ্ছে। ইরান ইস্যুতে তারা আর সোচ্চার নয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে যে সাপ্লাই চেইনের যে অব্যাহত সাপ্লাই ইরানে চলমান ছিল, গতকাল হঠাৎ করে সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন শিডিউল ছিল ইরানের অভ্যন্তরে কয়েকটি সমরাস্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র তৈরির কাঁচামাল সাপ্লাই দেওয়ার। রাশিয়া হঠাৎ করে সেটাও রিশিডিউল করে দিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে।
পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকে রাশিয়া ইউক্রেনকে নিজের হাতে পাওয়ার জন্য বা সেই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব মেনে কতটা বড় সমঝোতা করেছে। প্রশ্ন হলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব যে রাশিয়া এইভাবে মেনে নিল, বিশ্বব্যবস্থায় সেই যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়া আসলে কতটুকু চ্যালেঞ্জ করতে পারে? অথবা চীনের মতো দেশ কতটুকু রাশিয়ার উপর পরবর্তীতে বিশ্বাস রাখতে পারবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের আরো গভীরে যেতে হবে। রাশিয়ার এই হঠাৎ পরিবর্তনের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? সামরিক বিশ্লেষকরা কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার অর্থনীতিকে যে ধাক্কা দিয়েছে তা তাদের সহ্যসীমার বাইরে চলে গেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার আমদানি রপ্তানি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের তেল বিক্রি হচ্ছে কিন্তু অনেক কম দামে এবং সীমিত ক্রেতার কাছে।
দ্বিতীয়ত, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক ক্ষয়ক্ষতি যা প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি। হাজার হাজার সৈন্য হারিয়েছে রাশিয়া। ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার সব হারিয়েছে বিপুল পরিমাণে। তাদের সামরিক শক্তি যে একসময় ভয়ংকর মনে হতো, সেই ভয়ংকরতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
তৃতীয়ত, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পুতিনের উপর চাপ বাড়ছে। ওয়াগনার গ্রুপের বিদ্রোহ যদিও ব্যর্থ হয়েছে কিন্তু তা দেখিয়ে দিয়েছে যে পুতিনের ক্ষমতা অপরিহার্য নয়। অনেক অলিগার্ক এবং সামরিক কমান্ডার অসন্তুষ্ট। তারা চাইছে যুদ্ধ শেষ হোক এবং অর্থনীতি স্বাভাবিক হোক।
চতুর্থত, চীনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক যতটা গভীর মনে করা হয় ততটা নয়। চীন রাশিয়াকে সাহায্য করছে ঠিকই কিন্তু সেই সাহায্যের বিনিময়ে রাশিয়াকে অনেক ছাড় দিতে হচ্ছে। চীন সস্তায় তেল ও গ্যাস নিচ্ছে। রাশিয়া ক্রমশ চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি পুতিনের জন্য অস্বস্তিকর।
এই সমস্ত কারণ মিলিয়ে রাশিয়া হয়তো সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা তাদের জন্য ভালো হবে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে একটি সম্মানজনক প্রত্যাহার তাদের দরকার। এবং সেই প্রত্যাহারের বিনিময়ে তারা অনেক কিছু ছাড় দিতে রাজি।
কিন্তু এই সমঝোতার মূল্য কে দেবে? ইরান দেবে। গ্রীনল্যান্ড দেবে। বিশ্বব্যবস্থা দেবে। জাতিসংঘ দেবে। যে সকল নীতি ও আদর্শের উপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই সব নীতি এখন বিপদে।
ইরানের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়াকে একটি নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে দেখে আসছিল। সিরিয়ায় রাশিয়া ও ইরান একসঙ্গে কাজ করেছে। ইরান রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহ করেছে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য। বিনিময়ে তারা আশা করেছিল রাশিয়া তাদের পাশে থাকবে যখন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল আক্রমণ করবে।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সেই আশা মিথ্যা ছিল। রাশিয়া নিজের স্বার্থে ইরানকে জলাঞ্জলি দিতে রাজি। এটি ইরানের জন্য একটি বড় ধাক্কা। তাদের কৌশলগত পরিকল্পনা নতুন করে ভাবতে হবে। তারা এখন আর রাশিয়ার উপর নির্ভর করতে পারবে না। তাদের নতুন মিত্র খুঁজতে হবে অথবা একা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
চীনের জন্যও এই পরিস্থিতি শিক্ষণীয়। তারা দেখছে যে রাশিয়া কতটা দ্রুত পক্ষ বদলাতে পারে। তারা বুঝতে পারছে যে কঠিন সময়ে রাশিয়া নির্ভরযোগ্য মিত্র নয়। তাইওয়ান ইস্যুতে যদি কোনোদিন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত হয়, সেক্ষেত্রে রাশিয়া চীনের পাশে থাকবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যবস্থার দিক থেকে দেখলে এই ঘটনা একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, জাতিসংঘ যার কেন্দ্রে ছিল, সেই ব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র একটি একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে যা তার ইচ্ছামতো বিশ্ব চালাতে চায়। এবং রাশিয়ার মতো দেশও সেই নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ছোট এবং দুর্বল দেশগুলোর কী হবে? তারা কীভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে? যদি রাশিয়ার মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে বাংলাদেশ বা এই ধরনের দেশগুলো কী করবে?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বিশ্বাস বা আদর্শের কোনো স্থান নেই। এখানে শুধু স্বার্থ কাজ করে। এবং শক্তিশালী দেশগুলো তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যা ইচ্ছা তা করতে পারে। দুর্বলদের কাঁদতে হয়।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য শিক্ষা হলো যে বৃহৎ শক্তির উপর অন্ধ নির্ভরতা বিপজ্জনক। আজ যে দেশ মিত্র, কাল সে শত্রু হতে পারে। আজ যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়, কাল সে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারে। তাই নিজের শক্তি বাড়ানো দরকার। নিজের অর্থনীতি শক্তিশালী করা দরকার। নিজের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা দরকার যাতে একটি দেশের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হতে হয়।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসরাইলের ভূমিকা। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, যিনি এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, তিনি ইসরাইলের স্বার্থের একজন কট্টর সমর্থক। তিনি প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এর পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিলেন। সেই চুক্তি আরব দেশগুলোকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বাধ্য করেছিল।
এখন তিনি আবার সক্রিয়। এবার তার টার্গেট সম্ভবত ইরান। ইরান ইসরাইলের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে বিবেচিত। ইরানের পারমাণু কর্মসূচি ইসরাইলের জন্য অস্তিত্বের হুমকি। তাই ইরানকে দুর্বল করা ইসরাইলের কৌশলগত অগ্রাধিকার। এবং রাশিয়াকে ইরান থেকে দূরে সরিয়ে আনা সেই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই বৈঠকে যা ঘটেছে তা দেখে মনে হচ্ছে কুশনার সফল হয়েছেন। রাশিয়া ইরান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তারা সাপ্লাই বন্ধ করছে। তারা ইরানের পারমাণু কর্মসূচিতে বাধা দিচ্ছে। এর ফলে ইরান আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য আক্রমণ করা সহজ হবে।
গাজা পরিষদের বিষয়টিও এই প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। এই পরিষদ তৈরির পেছনে যে উদ্দেশ্য তা স্পষ্ট নয়। গাজা পুনর্গঠনের কথা বলা হচ্ছে কিন্তু আসলে কী হবে? ফিলিস্তিনিদের কি তাদের জমি ফেরত দেওয়া হবে? তাদের কি স্বাধীন রাষ্ট্র দেওয়া হবে? নাকি এটি শুধু একটি আড়াল যার আড়ালে ইসরাইলের সম্প্রসারণ চলবে?
আটটি মুসলিম দেশ এই পরিষদে যোগ দিয়েছে এবং আট বিলিয়ন ডলার দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু তারা বিনিময়ে কী পাবে? ফিলিস্তিনিদের কি কোনো উপকার হবে? নাকি এই টাকা শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের সামরিক খাতে ব্যয় হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সময়ই দেবে।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন ঘটছে। পুরনো নিয়ম ভেঙে যাচ্ছে। নতুন নিয়ম তৈরি হচ্ছে। এবং যারা শক্তিশালী তারাই এই নতুন নিয়ম তৈরি করছে। দুর্বলদের মতামতের কোনো মূল্য নেই।
রাশিয়ার এই আত্মসমর্পণ ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। এটি দেখায় যে সুপারপাওয়ার হওয়ার দাবি করলেই সুপারপাওয়ার হওয়া যায় না। পারমাণু অস্ত্র থাকলেই দেশ শক্তিশালী হয় না। অর্থনৈতিক শক্তি লাগে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা লাগে। মিত্রদের নেটওয়ার্ক লাগে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি লাগে।
পুতিন হয়তো ভেবেছিলেন ইউক্রেন আক্রমণ করে তিনি দ্রুত জয়ী হবেন। সেটি হয়নি। তিন বছর ধরে যুদ্ধ চলছে এবং রাশিয়া ক্লান্ত। এখন তিনি বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন এবং সেই পথ পেতে গিয়ে অনেক কিছু ছাড় দিচ্ছেন। এটি একজন নেতার কৌশলগত ব্যর্থতার উদাহরণ।
আগামী দিনগুলোতে কী হবে তা দেখার বিষয়। ইউক্রেন যুদ্ধ কি শেষ হবে? রাশিয়া কি ইউক্রেনের কিছু অংশ নিয়ে সন্তুষ্ট হবে? যুক্তরাষ্ট্র কি গ্রীনল্যান্ড দখল করবে? ইরানে কি আক্রমণ হবে? গাজা পরিষদ কি সফল হবে? এই সব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে বিশ্ব একটি অনিশ্চিত সময়ে প্রবেশ করেছে। পুরনো নিয়ম আর কাজ করছে না। নতুন নিয়ম এখনো তৈরি হয়নি। এই অন্তর্বর্তী সময়ে যে কোনো কিছু ঘটতে পারে। এবং সেই যে কোনো কিছুর জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমাদের এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। আমাদের নিজেদের শক্তি বাড়াতে হবে। আমাদের অর্থনীতি মজবুত করতে হবে। আমাদের শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে। আমাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
কারণ এই অনিশ্চিত বিশ্বে দুর্বল ও বিভক্ত জাতির কোনো স্থান নেই। শুধু শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ জাতিই টিকে থাকতে পারে। এটাই বাস্তবতা এবং এই বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতে হবে।
পরিশেষে বলা যায় যে ক্রেমলিনের সেই অন্ধকার গলিপথে যা ঘটেছে তা সারা বিশ্বকে প্রভাবিত করবে। রাশিয়ার এই নীরব আত্মসমর্পণ ইতিহাসের বইয়ে লেখা থাকবে। এবং যারা এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে তারাই ভবিষ্যতে সফল হবে। বাকিরা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। পছন্দ আমাদের।
