
# মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ঝড়ের পূর্বাভাস: ইউরোপীয় বিমান বাতিলের পেছনে কী লুকিয়ে আছে?
গত কয়েক ঘণ্টায় বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা সাধারণ চোখে দেখলে হয়তো অনেকেই বুঝতে পারবেন না। কিন্তু যারা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন, তাদের কাছে এই সংকেতগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট এবং ভয়ংকর। ইউরোপের প্রধান প্রধান বিমান সংস্থাগুলো হঠাৎ করেই তাদের মধ্যপ্রাচ্যগামী সকল রাত্রিকালীন ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে যে কারণ লুকিয়ে আছে, সেটা জানলে আপনার মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত নেমে যাবে।
প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি বিমান কোম্পানি তাদের ফ্লাইট বাতিল করলে এতে এত বড় করে দেখার কী আছে? উত্তরটা খুঁজতে গেলে প্রথমে বুঝতে হবে মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলটি কেবল একটি গন্তব্য নয়, বরং এটি হলো সমগ্র পৃথিবীর বিমান চলাচলের প্রাণকেন্দ্র। ইউরোপ থেকে যদি আপনি এশিয়া যেতে চান, আফ্রিকায় যেতে চান, অস্ট্রেলিয়ায় যেতে চান কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছাতে চান, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা এবং বিমানবন্দরগুলো ব্যবহার না করে কোনো উপায় নেই।
দুবাই, দোহা এবং আবুধাবির মতো বিমানবন্দরগুলো শুধু ট্রানজিট পয়েন্ট নয়, এগুলো হলো বিশ্ব বিমান চলাচলের মূল ধমনী। এই ধমনীতে রক্ত চলাচল বন্ধ হলে পুরো শরীর অবশ হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউরোপীয় বিমান সংস্থাগুলো এই মধ্যপ্রাচ্যের হাবগুলো ব্যবহার করে তাদের সামগ্রিক ব্যবসার পরিধি অন্তত তেত্রিশ শতাংশ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। যাত্রীবাহী বিমান হোক কিংবা কার্গো বিমান, সব ক্ষেত্রেই এই পরিসংখ্যান প্রযোজ্য।
জাপান থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া, ভারতের মতো বিশাল দেশ থেকে শুরু করে আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চল, সবকিছুকে যুক্ত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান সংস্থাগুলো কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট এবং বিমানবন্দর ব্যবহার করেই একশ এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যবসা পরিচালনা করছে। এই সংখ্যাটি একবার মাথায় রাখুন। একশ এক বিলিয়ন ডলার। এত বিপুল পরিমাণ অর্থ জড়িত যেখানে, সেখানে কোনো সিদ্ধান্ত হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ফ্লাইট গ্লোবালের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তাদের বিশ্লেষণে নিশ্চিত করেছে যে ইউরোপীয় বিমানগুলো যদি মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট পয়েন্টগুলো এবং এই অঞ্চলের বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে না পারে, তাহলে তাদের বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হবে। এই বিকল্প রুটে কমপক্ষে বিশ শতাংশ অতিরিক্ত জ্বালানি প্রয়োজন হবে। শুনতে হয়তো সামান্য মনে হচ্ছে, কিন্তু এই বিশ শতাংশ অতিরিক্ত জ্বালানি খরচের কারণে মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের তেরো বিলিয়ন ইউরোর ক্ষতি হতে পারে। তেরো বিলিয়ন ইউরো। মাত্র তিন দিনে। এই পরিসংখ্যান কল্পনা করতেও কষ্ট হয়।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, এত বড় আর্থিক ঝুঁকি জেনেও ইউরোপের বিমান সংস্থাগুলো কেন হঠাৎ করে তাদের ফ্লাইট বাতিল করল? উত্তরটা ভয়ংকর এবং স্পষ্ট। যতক্ষণ না বড় ধরনের বাস্তব ঝুঁকি থাকে, যতক্ষণ না সম্ভাব্য হামলার একেবারে সুনির্দিষ্ট এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকে, ততক্ষণ কখনোই ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই ধরনের বড় আর্থিক ক্ষতি মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে না। কিন্তু এবার তারা ঠিক তাই করেছে। এর মানে কী? এর মানে হলো তথ্য আছে। নিশ্চিত তথ্য। আর সেই তথ্যটা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত হামলার প্রস্তুতি।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো নিশ্চিত করছে যে ইরানের ভেতর চূড়ান্ত হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপের বড় বড় বিমান সংস্থাগুলো তাদের সকল ফ্লাইট বাতিল করেছে। সন্ধ্যার পর থেকে পুরো রাত্রি কোনো ইউরোপীয় বিমান মধ্যপ্রাচ্যে চলাচল করবে না। এটা সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। কোনো ব্যতিক্রম নেই।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কঠিন মিত্র। ন্যাটোর অংশ হিসেবে তাদের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানের একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো বড় সামরিক অভিযানের পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের অবশ্যই পূর্ব সংকেত দেয়। এর উদ্দেশ্য হলো মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আর এবার ঠিক সেটাই ঘটেছে।
সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের জানিয়ে দিয়েছে যে আগামী একত্রিশে জানুয়ারির মধ্যে যেকোনো দিন ইরানে চূড়ান্ত হামলা করা হতে পারে। এই দিকনির্দেশনা পাওয়ার পরপরই ইউরোপের বড় বড় বিমান সংস্থাগুলো আগামী একত্রিশে জানুয়ারি পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সকল দেশে তাদের রাত্রিকালীন ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছে। এই সময়সীমাটি কাকতালীয় নয়। এটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া তথ্যের সাথে সম্পর্কিত।
এখন প্রশ্ন হলো, এই হামলা কখন হবে? আজ রাতেই? কাল রাতে? নাকি একেবারে একত্রিশে জানুয়ারির রাতে? কেউ জানে না। কিন্তু যেটা জানা গেছে, সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্র চারদিক থেকে ইরানকে ঘিরে ধরার পরিকল্পনা করেছে। উত্তরে আজারবাইজান এবং তুরস্কের বিমান ঘাঁটি। পশ্চিমে ইসরাইলের সামরিক ঘাঁটিগুলো। দক্ষিণে আরব সাগরের কাছে ওমানের ঘাঁটি এবং পারস্য উপসাগরের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক স্থাপনাগুলো। সব দিক থেকে একযোগে হামলার প্রস্তুতি চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল পরিকল্পনা সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে, সেটা অত্যন্ত কৌশলগত। প্রথম দশ থেকে পনেরো মিনিটের হামলায় ইরানের সম্পূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেওয়াই তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। যদি তারা এই লক্ষ্যে সফল হয়, তাহলে পরবর্তী যেকোনো বিমান হামলা অনেক সহজ হয়ে যাবে। যুদ্ধবিমানগুলো নির্বিঘ্নে তাদের কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।
কিন্তু এখানেই জটিলতা শুরু। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন আর আগের মতো নেই। বিশেষ করে চীনের নতুন প্রজন্মের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেমন এইচ কিউ উনিশ এবং এইচ কিউ নাইনবি, এগুলো অত্যন্ত উন্নত এবং শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকে নিষ্ক্রিয় করতে না পারে, তাহলে তাদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে।
ইরান ইতোমধ্যেই পরিষ্কার করে দিয়েছে তাদের অবস্থান। তারা বলেছে, কতগুলো মিসাইল দিয়ে হামলা করা হলো সেটা তাদের বিবেচনার বিষয় নয়। এক হাজার মিসাইল হোক বা মাত্র একটি মিসাইল, যেকোনো হামলাই তাদের কাছে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা হিসেবে বিবেচিত হবে। এমনকি একটি মেশিনগান দিয়ে যুদ্ধবিমান থেকে আক্রমণ করা হলেও তারা সেটাকে সর্বাত্মক হামলা হিসেবে দেখবে এবং পাল্টা জবাব দেবে তাদের সম্পূর্ণ সামরিক শক্তি দিয়ে।
এই পরিস্থিতিতে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। যুক্তরাষ্ট্র একটি সুপারপাওয়ার। আর সুপারপাওয়ার বলতে সেই দেশকে বোঝায় যার একা পুরো পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে। তাদের কাছে এমন অনেক আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে যেগুলো এখনো কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে সেই প্রযুক্তিগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে নামবে। সুতরাং ইরানের জন্যও এই হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।
তবে অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকি কম নয়। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের যে বিশাল সামরিক অবকাঠামো রয়েছে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে যে ঘাঁটিগুলো তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো হারানোর ঝুঁকিও থাকছে। ইরান, ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র, এই ত্রিপক্ষীয় সংঘাতে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করছে কে কতটা দীর্ঘ সময় ধরে লজিস্টিক সাপোর্ট বজায় রাখতে পারবে। অস্ত্রের সরবরাহ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, এই বিষয়গুলোই নির্ধারণ করবে যুদ্ধের ফলাফল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা দরকার। বারো দিনের যুদ্ধে যখন ইরান ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, তখন রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো প্রথম হামলাতেই অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিল। ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ অতর্কিতভাবে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই সময় ইরান জরুরি ভিত্তিতে রাশিয়ার কাছে সাহায্য চেয়েছিল। তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো পুনরায় সক্রিয় করার জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু রাশিয়া সেই সময় কোনো টেকনিশিয়ান বা লজিস্টিক সাপোর্ট পাঠায়নি। ফলে ইরান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানগুলো নির্বিঘ্নে আক্রমণ চালাতে পেরেছিল।
কিন্তু এইবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাশিয়া যেখানে পিছিয়ে গিয়েছিল, সেখানে এগিয়ে এসেছে চীন। আর চীন এগিয়ে এসেছে পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে। প্রথম দফায় চীন পনেরোটি বিশাল কার্গো বিমান ভর্তি করে লজিস্টিক সাপোর্ট পাঠিয়ে দিয়েছে ইরানে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ যেগুলো হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মেরামত করতে প্রয়োজন হবে। চীন আগে থেকেই হিসাব করে রেখেছে যে কোন ধরনের হামলায় কী কী ক্ষতি হতে পারে এবং সেই অনুযায়ী সরবরাহ পাঠিয়ে দিয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীনের সামরিক টেকনিশিয়ানরা এখন ইরানে অবস্থান করছে। বড় কয়েকটি টিম ধাপে ধাপে ভাগ করে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব স্থানে চীনের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং রাডার রয়েছে, সেখানে এই টেকনিশিয়ানরা উপস্থিত। এর মানে হলো এই যুদ্ধে চীনের অংশগ্রহণ এখন অনেকটাই সরাসরি।
এই বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চীনের নাগরিক এবং সামরিক বিশেষজ্ঞরা যখন ইরানের সামরিক স্থাপনায় অবস্থান করছে, তখন কোনো হামলায় তাদেরও ক্ষতির আশঙ্কা থাকছে। মিসাইল বা বোমা জাতীয়তা দেখে বিস্ফোরিত হয় না। যে কেউ এর আওতায় থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং বলা যায়, চীন সচেতনভাবেই এই ঝুঁকি নিয়ে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে।
এখন সবার চোখ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশের দিকে। কখন সেই প্রথম মিসাইল উড়ে আসবে? কখন শুরু হবে সেই ভয়ংকর রাত? একটা বিষয় নিশ্চিত, এই ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত কোনো গুজব বা অনুমানের উপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়নি। এত বড় আর্থিক ক্ষতি মেনে নিয়ে ইউরোপের বিমান সংস্থাগুলো যখন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন বুঝতে হবে তথ্য নির্ভরযোগ্য এবং হামলা আসন্ন।
আগামী কয়েক দিন বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে যা ঘটবে, তা হয়তো পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে। তিনটি শক্তি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি নিয়ে। অন্যদিকে ইরান তার দৃঢ় সংকল্প এবং চীনের সমর্থন নিয়ে। আর মাঝখানে ইসরাইল, যে এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। কে জিতবে? কে হারবে? এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, আগামী একত্রিশে জানুয়ারির আগেই বিশ্ব সেই উত্তর পেয়ে যাবে।
