
বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে এখন এক অদ্ভুত নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। এই নাটকের কেন্দ্রে রয়েছে চরমোনাই পীর পরিবারের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তারা এমন কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, এমন কিছু বক্তব্য দিচ্ছে, যা দেখে মনে হচ্ছে তারা নিজেরাই নিজেদের রাজনৈতিক কবর খুঁড়ছে। কিংবা হয়তো এটা একটা বড় ধরনের কূটনৈতিক চাল, যেখানে তারা জামাতকে চাপে ফেলে আরো বেশি সুবিধা আদায় করতে চাইছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই খেলায় তারা শেষ পর্যন্ত জিতবে নাকি হারবে?
গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে আলোচনা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, তা হলো জামাতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একাদশ দলীয় জোটের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন। এই টানাপোড়েনের মূল কারণ হলো আসন বণ্টন নিয়ে মতবিরোধ। আর এই মতবিরোধের সামনের সারিতে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, যারা চরমোনাই নামেই বেশি পরিচিত।
প্রথম আলোর একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে জামাতের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যে নতুন জোটের ইঙ্গিত দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। এই খবরটি রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কারণ এর মানে হলো চরমোনাই জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণে যেতে চাইছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কোথায় যাবে? কার সঙ্গে যাবে? আর সেই নতুন জোট কি আদৌ কোনো রাজনৈতিক ফলাফল এনে দিতে পারবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে গণতান্ত্রিক রাজনীতির মৌলিক সমীকরণ। সারা পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি সাধারণ প্যাটার্ন দেখা যায়, আর তা হলো দ্বিদলীয় বা দুই বলয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা। আপনি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকান, সেখানে অনেক রাজনৈতিক দল আছে। কিন্তু মূল লড়াই হয় ডেমোক্র্যাট আর রিপাবলিকানদের মধ্যে। তৃতীয় কোনো দলের কথা সেখানে কেউ জানেই না। গ্রিন পার্টি আছে, লিবার্টেরিয়ান পার্টি আছে, কিন্তু তারা কখনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিযোগিতার ধারেকাছেও আসতে পারে না।
ভারতের দিকে তাকান। সেখানে শত শত রাজনৈতিক দল আছে। প্রতিটি রাজ্যে আলাদা আলাদা আঞ্চলিক দল আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতিতে মূল লড়াই হয় কংগ্রেস আর বিজেপির মধ্যে। বাকি সব দল এই দুই বলয়ের কোনো একটিতে যোগ দেয়। তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের চেষ্টা বারবার হয়েছে, কিন্তু কখনো সফল হয়নি।
ইংল্যান্ডে যান। সেখানে কনজার্ভেটিভ আর লেবার পার্টির মধ্যে লড়াই। লিবারেল ডেমোক্র্যাট আছে, গ্রিন পার্টি আছে, কিন্তু তারা কখনো সরকার গঠন করতে পারে না। ফ্রান্সে, জার্মানিতে, ইতালিতে, যেখানেই যান, একই চিত্র। দুটি প্রধান বলয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা, বাকি সব দল এই দুই বলয়ের সাথে যুক্ত হয়ে থাকে।
পাকিস্তানের কথাই ধরুন। সেখানে ঘুরেফিরে দুই থেকে তিনটি প্রধান দলের মধ্যে লড়াই। হয় মুসলিম লীগ বনাম পিপলস পার্টি, নয়তো মুসলিম লীগ বনাম তেহরিক-ই-ইনসাফ। তৃতীয় কোনো শক্তি সেখানে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা কী? এখানে মূল লড়াই হচ্ছে জামাত বলয় বনাম বিএনপি বলয়। আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতার বাইরে এবং তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তাই বর্তমানে এই দুই বলয়ই প্রধান প্রতিযোগী। এই দুই বলয়ের বাইরে তৃতীয় কোনো শক্তির অস্তিত্ব নেই, থাকার সুযোগও নেই।
এই বাস্তবতায় চরমোনাই যদি জামাত জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন কোনো জোট গঠন করে, তাহলে সেই জোট কার পক্ষে কাজ করবে? হয় জামাতের পক্ষে, নয় বিএনপির পক্ষে। তৃতীয় কোনো অপশন নেই। আর যদি জামাত জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন জোট করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেই জোট বিএনপির অনুকূলে কাজ করবে। কারণ জামাতের বিরোধী হলে বিএনপির পক্ষে যেতে হবে, এটাই রাজনীতির গণিত।
কিন্তু এখানে একটি বড় প্রশ্ন আসে। বিএনপি কি চরমোনাইকে নিতে চাইবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
প্রথমত, বিএনপি ইতোমধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সঙ্গে জোটবদ্ধ। তাদের ইসলামপন্থী মিত্র হিসেবে জমিয়ত রয়েছে। এখন চরমোনাইকে নিলে জমিয়তের সঙ্গে সমস্যা হতে পারে। কারণ চরমোনাই আর জমিয়ত একই ধারার রাজনীতি করে এবং তাদের মধ্যে ভোটব্যাংকের প্রতিযোগিতা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বিএনপি এমনিতেই তাদের জোট সঙ্গীদের খুব কম আসন দেয়। এনসিপিকে দুই তিনটির বেশি আসন দিতে রাজি হয়নি। সেখানে চরমোনাইকে কতগুলো আসন দেবে? দুইটি? তিনটি? এত কম আসনের জন্য চরমোনাই কি জামাত জোট ছেড়ে বিএনপিতে যাবে?
তৃতীয়ত, বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ চরমোনাইয়ের রাজনৈতিক ধারাকে অপছন্দ করে। জামাতের মতো উদার ইসলামপন্থী দলও চরমোনাইকে ম্যানেজ করতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বিএনপির পক্ষে এটা আরো কঠিন হবে। বিএনপির অভ্যন্তরে যে ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়েছে, সেখানে চরমোনাইয়ের মতো কড়া ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে সহাবস্থান করা সহজ হবে না।
চতুর্থত, বিএনপি এখন নিজেই সংকটে রয়েছে। তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে। এই অবস্থায় তারা নতুন কোনো সমস্যা নিতে চাইবে না। চরমোনাইকে জোটে নিলে যে ধরনের জটিলতা তৈরি হবে, সেটা বিএনপির জন্য আরো বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই সব বিষয় বিবেচনা করলে বোঝা যায়, বিএনপির সঙ্গে চরমোনাইয়ের জোট বা সমঝোতার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। সরাসরি জোট তো দূরের কথা, গোপন সমঝোতার সুযোগও নেই বললেই চলে।
তাহলে চরমোনাই কেন এই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে? কেন তারা নতুন জোটের ইঙ্গিত দিচ্ছে? কেন তারা বলছে যে বারো তারিখের আগে অনেক কিছু ঘটবে?
এই প্রশ্নের উত্তর হলো, এটা একটা কূটনৈতিক চাল। এটা নেগোশিয়েশনের কৌশল। চরমোনাই জামাতকে ভয় দেখাতে চাইছে। তারা বলতে চাইছে যে, তোমরা আমাদের দাবি না মানলে আমরা বিকল্প পথে যেতে পারি। আমরা বিএনপির সঙ্গে কথা বলতে পারি। আমরা নতুন জোট করতে পারি। তোমরা আমাদের ছাড়া একা হয়ে যাবে।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই ভয় দেখানোর কৌশল কাজ করছে না। জামাত জানে যে চরমোনাইয়ের বিকল্প নেই। তারা জানে যে চরমোনাই শেষ পর্যন্ত জোটে থাকতে বাধ্য। কারণ জোটের বাইরে গেলে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বই বিপন্ন হবে।
এখানে একটু গভীরে যাওয়া যাক। চরমোনাই কি আসলেই নতুন কোনো জোট গঠন করতে পারবে? কাকে নিয়ে করবে এই জোট?
বলা হচ্ছে, মামুনুল হকের দলকে নিয়ে তারা জোট করতে পারে। কিন্তু এটা কি বাস্তবসম্মত? মামুনুল হক এবং তার অনুসারীরা এখন জামাত জোটের সঙ্গে রয়েছে। চরমোনাই যদি বেরিয়ে যায়, তাহলে জামাত মামুনুল হকদের আরো বেশি গুরুত্ব দেবে। চরমোনাই যে চল্লিশ পঁয়তাল্লিশটি আসন দাবি করছে, তার একটা বড় অংশ মামুনুল হকদের দেওয়া যেতে পারে। তাহলে মামুনুল হকরা কেন চরমোনাইয়ের সঙ্গে যাবে? তারা তো জামাত জোটে থাকলে আরো বেশি লাভবান হবে।
এছাড়া আরো অনেক ছোট ছোট ইসলামী দল রয়েছে যারা জামাত জোটে যুক্ত হতে চায়। চরমোনাই বেরিয়ে গেলে সেই শূন্যস্থান তারা পূরণ করবে। এমন অনেক দল আছে যারা তিনটি বা পাঁচটি আসন পেলেও খুশি হবে। জামাতের কাছে বিকল্পের অভাব নেই।
তাহলে চরমোনাই একা কি করবে? শুধু মামুনুল হকের দল ছাড়া আর কাকে নিয়ে জোট করবে? আর মামুনুল হকরাও যদি না আসে, তাহলে চরমোনাই সম্পূর্ণ একা হয়ে যাবে। কোনো সঙ্গী থাকবে না। বন্ধুহীন, এতিম, মিসকিন অবস্থায় পড়বে তারা।
এই বাস্তবতা চরমোনাইয়ের নেতারা বুঝেন না, এমন না। তারা খুব ভালো করেই জানেন যে জোটের বাইরে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু তারা এই ভয় দেখিয়ে আরো কিছু আসন আদায় করতে চাইছেন। তারা চাইছেন জামাত তাদের দাবি মেনে নিক। তারা চাইছেন আরো বেশি সম্মান, আরো বেশি গুরুত্ব।
কিন্তু এই কৌশল যে ব্যাকফায়ার করতে পারে, সেটা তারা হয়তো ভাবছেন না। জামাত যদি মনে করে যে চরমোনাই বারবার একই কথা বলছে, বারবার একই হুমকি দিচ্ছে, তাহলে এক পর্যায়ে জামাতও বিরক্ত হতে পারে। জামাত বলতে পারে, যাও তোমরা যেখানে যেতে চাও যাও, আমরা অন্যদের নিয়ে কাজ করব।
এখন আসি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে। চরমোনাই বলছে যে তারা ইসলামের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে চায়। তারা বলছে যে ইসলামের বক্স এক রাখতে হবে। কিন্তু এই কথার বাস্তব ভিত্তি কতটুকু?
একাদশ দলীয় জোটের দিকে তাকান। সেখানে শুধু ইসলামপন্থী দল নেই। এলডিপি আছে, এনসিপি আছে। এই দলগুলো সরাসরি ধর্মভিত্তিক দল নয়। তারা প্রচলিত গণতান্ত্রিক দল। তাহলে এই জোটকে আপনি কীভাবে ইসলামের বক্স বলবেন? চরমোনাই কি এলডিপি বা এনসিপিকে জোট থেকে বের করে দিতে বলছে? না, তারা সেটা বলছে না। তারা শুধু বলছে যে আমাদের না জানিয়ে এনসিপির সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে। কিন্তু এনসিপির সঙ্গে জোট করা যাবে না, এ কথা তারা বলছে না।
আবার চরমোনাই নিজেও বলে থাকে যে বৃহত্তর স্বার্থে ডান বাম যে কারো সঙ্গে ঐক্য হতে পারে। তাহলে ইসলামের বক্স এক রাখার কথা কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ? এটা আসলে একটা আবেগপ্রবণ স্লোগান, যার ব্যবহারিক ভিত্তি দুর্বল।
তবে এটা সত্য যে ইসলামপন্থী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকা দরকার। মুসলমানদের ভোট ইসলামপন্থীদেরই পাওয়া উচিত। কিন্তু সেই ঐক্য রাখতে হলে কিছু ছাড় দিতে হয়, কিছু সমঝোতা করতে হয়। সব দাবি একসঙ্গে মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না। চরমোনাই যদি এটা না বোঝে, তাহলে তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করবে।
এখন আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। শেষ পর্যন্ত কী হবে? চরমোনাই কি সত্যিই জোট ছাড়বে? নাকি এটা শুধু দরকষাকষি?
আমার মূল্যায়ন হলো, শেষ পর্যন্ত চরমোনাই জামাত জোটেই থাকবে। তারা হয়তো আরো কিছুদিন এই নাটক করবে, হয়তো আরো কিছু বড় বড় কথা বলবে, হয়তো বিএনপির সঙ্গে মিটিংয়ের গুজব ছড়াবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জোটে ফিরে আসবে। কারণ তাদের কোনো বিকল্প নেই। জোটের বাইরে তাদের অস্তিত্বই নেই।
চরমোনাই যদি আলাদাভাবে নির্বাচনে যায়, তাহলে তারা একটি আসনও পাবে না। তাদের সাংগঠনিক শক্তি আছে, মুরিদ আছে, কিন্তু সেই শক্তি দিয়ে আসন জেতা যায় না। বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় জোটের সমর্থন ছাড়া ছোট দলগুলোর পক্ষে জেতা প্রায় অসম্ভব। চরমোনাই এটা জানে।
তাই এই সব নাটক শেষ পর্যন্ত একটাই উদ্দেশ্যে, আর তা হলো জামাতের কাছ থেকে আরো কিছু সুবিধা আদায় করা। হয়তো আরো কয়েকটি আসন, হয়তো আরো কিছু সাংগঠনিক পদ, হয়তো আরো কিছু সম্মান। এই সব কিছু পেতে তারা এই চাপ দিচ্ছে।
কিন্তু এই কৌশল কতটুকু কাজ করবে, সেটা দেখার বিষয়। জামাত যদি চাপে নতি স্বীকার করে, তাহলে অন্যান্য জোট সঙ্গীরাও একই কাজ করবে। তখন জামাতের পক্ষে সবাইকে সামলানো কঠিন হয়ে যাবে। তাই জামাত হয়তো একটা সীমা পর্যন্তই ছাড় দেবে, তার বেশি না।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। চরমোনাই বলছে যে বারো ফেব্রুয়ারির আগে অনেক কিছু ঘটবে। এই কথার মানে কী? এটা কি কোনো বড় ঘোষণার ইঙ্গিত? নাকি শুধুই হুমকি?
আমার ধারণা, এটা মূলত জামাতকে চাপ দেওয়ার জন্য বলা। বারো তারিখ কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ ডেডলাইন হতে পারে। হয়তো সেই তারিখের মধ্যে আসন বণ্টন চূড়ান্ত করতে হবে। তাই চরমোনাই বলতে চাইছে যে, এই তারিখের আগে তোমরা আমাদের দাবি না মানলে আমরা বড় কিছু করব।
কিন্তু এই বড় কিছু আসলে কী হতে পারে? বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা? সেটা অসম্ভব। নতুন জোট? সেটাও অবাস্তব। তাহলে কী? হয়তো কিছু বিবৃতি, কিছু সংবাদ সম্মেলন, কিছু কড়া কথা। এর বেশি কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এই প্রসঙ্গে বিএনপির অবস্থানটাও একটু দেখা দরকার। বিএনপি কি চরমোনাইয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করছে? পর্দার অন্তরালে কি কোনো আলোচনা চলছে?
এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে যৌক্তিকভাবে বিচার করলে বলা যায়, বিএনপির জন্য চরমোনাইয়ের সঙ্গে জোট করার কোনো লাভ নেই। বিএনপি এখন নিজেই সংকটে। তারা নিজেদের ভোটব্যাংক ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এই অবস্থায় চরমোনাইকে নিয়ে নতুন সমস্যায় জড়ানোর কোনো মানে হয় না।
তাছাড়া বিএনপির মধ্যে যে উদারপন্থী অংশ রয়েছে, তারা চরমোনাইয়ের মতো কট্টর ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে জোট করতে রাজি হবে না। এতে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমবে।
তাই বিএনপি যদি চরমোনাইয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগও করে থাকে, সেটা সম্ভবত শুধু জামাতকে বিব্রত করার জন্য। সত্যিকারের কোনো জোটের প্রস্তাব সেখানে নেই।
এখন আসি চরমোনাইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তারা যদি সত্যিই জোট ছেড়ে দেয়, তাহলে কী হবে?
প্রথমত, তারা রাজনৈতিকভাবে একেবারে একলা হয়ে যাবে। কোনো সঙ্গী থাকবে না। মামুনুল হকরা আসবে না, অন্য কোনো ইসলামী দলও আসবে না। কারণ সবাই জানে যে জামাত জোটে থাকলে লাভ বেশি।
দ্বিতীয়ত, তারা নির্বাচনে একটি আসনও জিততে পারবে না। তাদের সব প্রার্থী হারবে। এতে তাদের সাংগঠনিক মনোবল ভেঙে পড়বে।
তৃতীয়ত, তাদের মুরিদ এবং সমর্থকদের মধ্যে হতাশা দেখা দেবে। অনেকে হয়তো অন্য দলে চলে যাবে। কারণ মানুষ বিজয়ীদের সঙ্গে থাকতে চায়, পরাজিতদের সঙ্গে না।
চতুর্থত, জামাত তাদের জায়গায় অন্য ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে আসবে। চরমোনাইয়ের অনুপস্থিতি জামাতের জন্য বড় কোনো সমস্যা হবে না। কারণ বিকল্প অনেক আছে।
এই সব কিছু বিবেচনা করলে বোঝা যায়, চরমোনাইয়ের জন্য জোট ছাড়া আত্মঘাতী হবে। তারা এটা জানে। তাই শেষ পর্যন্ত তারা জোটেই থাকবে।
কিন্তু এই যে বারবার হুমকি দেওয়া, বারবার নতুন জোটের কথা বলা, এটা তাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মানুষ তাদের কথায় গুরুত্ব দিচ্ছে না। কারণ সবাই জানে যে এগুলো ফাঁকা হুমকি। দিনশেষে চরমোনাই জামাতের কাছেই ফিরে যাবে।
এই প্রসঙ্গে জামাতের কৌশলটাও দেখা দরকার। জামাত খুব সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামলাচ্ছে। তারা চরমোনাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করছে না, আবার তাদের সব দাবিও মানছে না। তারা মাঝামাঝি একটা অবস্থান নিয়ে আছে।
জামাত জানে যে চরমোনাইয়ের বিকল্প নেই। তাই তারা খুব বেশি ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না। আবার চরমোনাইকে পুরোপুরি দূরে ঠেলে দিতেও চাইছে না। কারণ চরমোনাইয়ের একটা ভোটব্যাংক আছে, সেটা জোটের কাজে আসবে।
এই ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে জামাত হয়তো কিছু বাড়তি আসন দেবে। হয়তো চরমোনাইয়ের দাবির একটা অংশ মানবে। কিন্তু সব দাবি মানবে না। চরমোনাইকেও কিছু ছাড় দিতে হবে।
এখন দেখা যাক, এই টানাপোড়েন কীভাবে শেষ হয়। বারো তারিখের আগে কি সত্যিই কোনো বড় ঘটনা ঘটে? নাকি সব শান্তিপূর্ণভাবে মিটে যায়?
আমার অনুমান হলো, শেষ পর্যন্ত সব মিটে যাবে। চরমোনাই কিছুটা বাড়তি সুবিধা পাবে, জামাত কিছুটা ছাড় দেবে, আর জোট অটুট থাকবে। কারণ এই জোট ভেঙে গেলে কারোরই লাভ নেই। সবাই জানে যে ঐক্যবদ্ধ থাকলেই জেতা সম্ভব, বিভক্ত হলে সবাই হারবে।
তবে এই টানাপোড়েন থেকে একটা শিক্ষা নেওয়া দরকার। রাজনীতিতে অতি চালাকি ভালো ফল দেয় না। চরমোনাই যে কৌশল অবলম্বন করছে, সেটা স্বল্পমেয়াদে হয়তো কিছু সুবিধা এনে দেবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটা তাদের জন্য ক্ষতিকর হবে। কারণ মানুষ যখন দেখবে যে চরমোনাই বারবার একই খেলা খেলছে, তখন তাদের ওপর আস্থা কমে যাবে।
জামাতও এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। জোট সঙ্গীদের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ রাখা দরকার। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সবার সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। তাহলে এই ধরনের মতবিরোধ এড়ানো যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে নির্বাচন আসছে। এই নির্বাচনে কে জিতবে, সেটা নির্ভর করছে বিভিন্ন জোটের ঐক্যের ওপর। জামাত জোট যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে তাদের জেতার সম্ভাবনা বেশি। আর যদি এই ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলতে থাকে, তাহলে সেটা তাদের জন্য ক্ষতিকর হবে।
চরমোনাইয়ের নেতাদের উচিত এই বিষয়টা গভীরভাবে ভাবা। তারা যদি সত্যিই ইসলামের কল্যাণ চান, তাহলে তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকা দরকার। আসনের সংখ্যা নিয়ে হিসাব কষলে চলবে না। বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভাবতে হবে।
একই সঙ্গে জামাতেরও উচিত চরমোনাইয়ের কিছু যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া। জোটে সবার সম্মান রক্ষা করা দরকার। কেউ যদি মনে করে যে তাকে অবহেলা করা হচ্ছে, তাহলে সেই অসন্তোষ দূর করা উচিত।
শেষ পর্যন্ত রাজনীতি হলো সমঝোতার খেলা। এখানে কেউ সব কিছু পায় না। সবাইকে কিছু না কিছু ছাড় দিতে হয়। চরমোনাই এবং জামাত দুই পক্ষই যদি এটা বোঝে, তাহলে এই টানাপোড়েন সহজেই মিটে যাবে।
আর যদি না বোঝে, তাহলে চরমোনাই সত্যিই একলা হয়ে যাবে। রাজনীতির মাঠে তারা বন্ধুহীন হয়ে পড়বে। এটা তাদের জন্য বড় শিক্ষা হবে। কিন্তু সেই শিক্ষা নেওয়ার আগেই যদি তারা বুঝতে পারে, তাহলে ভালো।
বাংলাদেশের মানুষ এখন দেখতে চায় যে রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করুক। তারা চায় যে রাজনীতিবিদরা দেশের কল্যাণের কথা ভাবুক, নিজেদের স্বার্থের কথা না। চরমোনাই এবং জামাত দুই পক্ষই যদি এই আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি আরো সুন্দর হবে।
এই মুহূর্তে সবার চোখ বারো ফেব্রুয়ারির দিকে। সেদিন কী হয়, সেটা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে। চরমোনাই কি সত্যিই কোনো বড় পদক্ষেপ নেয়? নাকি সব কিছু আগের মতোই চলতে থাকে? উত্তর পাওয়া যাবে শীঘ্রই।
তবে একটা বিষয় নিশ্চিত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাটক কখনো শেষ হয় না। আজ চরমোনাই আর জামাতের মধ্যে টানাপোড়েন, কাল হয়তো অন্য কোনো দলের সঙ্গে। এটাই রাজনীতির স্বাভাবিক গতি। কিন্তু এই গতির মধ্যেও একটা দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। সেই দিকনির্দেশনা হলো দেশের কল্যাণ, জনগণের সেবা। যে দল এটা বুঝবে, তারাই শেষ পর্যন্ত জিতবে।
চরমোনাই এবং জামাত দুই পক্ষকেই এই সত্যটা মনে রাখতে হবে। নইলে দুই পক্ষই হারবে। আর জিতবে সেই শক্তি, যে জনগণের কাছে যেতে পারবে, জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে। এটাই গণতন্ত্রের চূড়ান্ত শিক্ষা।
এখন দেখা যাক, এই শিক্ষা কে কতটুকু গ্রহণ করে। ইতিহাস সাক্ষী হয়ে থাকবে।
