
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা সময়ের সাথে সাথে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয়। কখনো কখনো দুটি দলের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন এমন এক মোড় নেয় যা আগে কেউ কল্পনাও করেনি। ঠিক এমনই এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে গেলো গত সপ্তাহে। বাংলাদেশ জামাত ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তথা চরমোনাইয়ের মধ্যকার সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে জামাত প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে চরমোনাইকে জবাব দিলো।
ঘটনার শুরু হয়েছিল যখন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে শুধু জোট ছাড়াই নয়, তারা যাওয়ার সময় জামাতের বিরুদ্ধে এমন কিছু অভিযোগ তুলেছিলো যা রাজনৈতিক মহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। সংগঠনটির মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব জনাব গাজী আতাউর রহমান এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন যা জামাতের জন্য হজম করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
গাজী আতাউর রহমান তার বক্তব্যে দাবি করেছেন যে বাংলাদেশ জামাত ইসলামী আল্লাহর আইন ও ইসলামী আদর্শ থেকে ভিন্ন দিকে চলে গেছে। শুধু তাই নয়, তিনি এই অভিযোগের সমর্থনে এক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেত্রীর বক্তব্যকে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই ঘটনা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে বেশ বিস্ময়কর মনে হয়েছে। কারণ একটি ইসলামী দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে অন্য ধর্মাবলম্বীর বক্তব্যকে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা সাধারণত দেখা যায় না।
এই পরিস্থিতিতে জামাত আর চুপ করে বসে থাকেনি। ১৬ জানুয়ারি জামাত ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতি প্রদান করেন। এই বিবৃতিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে গাজী আতাউর রহমান যা বলেছেন তা সত্য নয়। জুবায়ের তার বিবৃতিতে লেখেন যে আজ জুমাবার বিকালে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির মুখপাত্র খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি সংগঠনের দায়িত্বশীল নেত্রীকে বরাত দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সঠিক নয়।
তবে জামাতের এই বিবৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল অন্য জায়গায়। এডভোকেট জুবায়ের সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গাজী আতাউর রহমান এমন মন্তব্য করেছেন। এই ধরনের কঠিন ভাষা জামাত অতীতে কখনো চরমোনাইয়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করেনি। এটাই এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক করে তুলেছে।
জামাত এবং চরমোনাইয়ের মধ্যকার সম্পর্কের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং জটিল। দুই দলের মধ্যে মতাদর্শগত বিরোধ নতুন কিছু নয়। চরমোনাই পীর পরিবার এবং তাদের অনুসারীরা দীর্ঘদিন ধরে জামাতের বিরুদ্ধে নানা ধরনের সমালোচনা করে আসছেন। এই সমালোচনা কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা অতিক্রম করেছে বলে অনেকে মনে করেন।
অতীতে চরমোনাইয়ের পক্ষ থেকে জামাত ও ছাত্রশিবিরকে নিয়ে যেসব মন্তব্য করা হয়েছে সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তারা বেশ কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। ছাত্রশিবিরকে বেয়াদব, বেয়ামল এবং বিশৃঙ্খল বলা হয়েছে। আরো এগিয়ে গিয়ে কেউ কেউ জামাতকে কাদিয়ানী এবং শিয়াদের চেয়েও নিকৃষ্ট বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি ইসলামের শত্রু এবং মুনাফেক শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে।
মজার বিষয় হলো আওয়ামী লীগও তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ে জামাতের বিরুদ্ধে এত কঠোর ভাষা ব্যবহার করেনি। তারা সাধারণত জামাতকে স্বাধীনতাবিরোধী এবং রাজাকার বলে সমালোচনা করতো। কিন্তু ইসলামের শত্রু বা মুনাফেক এই ধরনের ধর্মীয় অভিযোগ তারাও আনেনি।
এতকিছুর পরেও জামাত অতীতে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চরমোনাইকে জবাব দেয়নি। এটাই ছিল তাদের কৌশল। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে চরমোনাই যা খুশি বলুক, আমরা এ বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকবো। সংগঠন হিসেবে এই বিষয়গুলো ডিল করার কোনো প্রয়োজন নেই। গোলাম আযম থেকে শুরু করে মতিউর রহমান নিজামী পর্যন্ত কোনো আমীরে জামাত চরমোনাইয়ের সমালোচনার জবাব দেননি। জামাতের প্রেস উইংও কখনো এ বিষয়ে বিবৃতি দেয়নি।
তবে বিচ্ছিন্নভাবে জামাতের কিছু জনশক্তি ব্যক্তিগত উদ্যোগে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বরিশালের আব্দুল হাকিম মাদানী পাল্টা বই লিখেছেন। সিলেটের ইসহাক মাদানী বই লেখার পাশাপাশি মাঝে মাঝে মুনাজারাও করেছেন। আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ডক্টর আবুল কালাম আজাদ বাশার, মাওলানা ফখরুদ্দিন, মাওলানা আজিমউদ্দিন এরা মাঝে মাঝে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ওয়াজের ময়দানে তারেক মনোয়ার এবং আমির হামজার মতো বক্তারাও কখনো কখনো পাল্টা কথা বলেছেন। কিন্তু এগুলো ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সংগঠনের অফিসিয়াল অবস্থান নয়।
এখন প্রশ্ন হলো কেন হঠাৎ জামাত তাদের এই দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে এলো। উত্তর সম্ভবত নতুন বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতায় লুকিয়ে আছে। জামাত হয়তো মনে করছে যে নতুন পরিস্থিতিতে চরমোনাইকে আর ব্ল্যাংক চেক দেওয়া ঠিক হবে না। মিথ্যা অপবাদ এবং কুৎসা রটনার বিরুদ্ধে এবার তারা সোচ্চার হতে চায়।
চরমোনাই শুধু জোট ছেড়ে যায়নি, তারা যাওয়ার সময় জামাতের বিরুদ্ধে এমন কিছু অভিযোগ এনেছে যা জামাতের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে জামাত ইসলাম থেকে সরে গেছে এই ধরনের অভিযোগ তাদের মূল পরিচয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ কারণেই হয়তো এবার জামাত আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে।
জামাতের বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশ জামাত ইসলামী আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের আলোকে পরিচালিত একটি ইসলামী সংগঠন। তারা সবসময় রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আচরণ করে থাকে। কারো সঙ্গে রাজনৈতিক শিষ্টাচার পরিপন্থী আচরণ তারা করে না।
এদিকে আমীরে জামাত ডক্টর শফিকুর রহমানও এই পরিস্থিতিতে নীরব থাকেননি। তিনি ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন যেখানে লিখেছেন ধৈর্য পরীক্ষা সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সবাইকে ধৈর্য ধারণের তৌফিক দান করুন। তিনি আরো লিখেছেন অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন, তাহলে আল্লাহ তায়ালা আপনার সম্মান বাড়িয়ে দেবেন ইনশাআল্লাহ।
আমীরে জামাতের এই বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় তিনি দুটি বার্তা দিতে চেয়েছেন। একদিকে তিনি চরমোনাইকে পরোক্ষভাবে নসিহত করেছেন যে কুৎসা রটনা না করে ধৈর্য ধারণ করা উচিত। অন্যদিকে নিজ দলের কর্মীদেরকেও বলেছেন যে শান্তিপূর্ণভাবে এবং প্রজ্ঞার সাথে বিষয়টি ডিল করতে হবে। মানে চরমোনাইকে টিট ফর ট্যাট করা যাবে না।
এখানে একটি মজার বিষয় উল্লেখ করা দরকার। আমীরে জামাত একবার মজা করে পীর সাহেব চরমোনাইকে বলেছিলেন যে প্রথম আলোর জরিপে তাদের ভোট শূন্য দশমিক শূন্য এক শতাংশ দেখানো হয়েছে। অথচ ঐ জরিপের বিরুদ্ধে পুরো জামাত শিবির সমাজ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এটা ছিল একটা রসিকতা। কিন্তু পীর সাহেব চরমোনাই এই মন্তব্যকে খোঁচা হিসেবে নিয়েছেন এবং বলেছেন জামাতের লক্ষণ ভালো দেখছেন না। সেন্স অফ হিউমার বুঝতে না পারাটা দুঃখজনক।
তবে এই সমস্ত বিতর্কের মধ্যেও একজন ব্যক্তির প্রতি সবার শ্রদ্ধা অটুট রয়েছে। তিনি হলেন পীর সাহেব চরমোনাই জনাব মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম। তিনি ব্যক্তিগতভাবে জামাতের বিরুদ্ধে কোনো কটু কথা বলেননি। আওয়ামী লীগ আমলে তিনি যখন ঐক্যের কথা বলেছিলেন তখন আমীরে জামাত ফেসবুক পোস্ট দিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন এবং প্রিয় ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন। এই সম্মান এখনো অক্ষুণ্ণ আছে।
কিন্তু চরমোনাইয়ের অন্যান্য নেতা ও বক্তারা জামাতের বিরুদ্ধে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বাবা পীর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বক্তারা জামাত বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। ফতোয়া দেওয়া হয়েছে, বই লেখা হয়েছে, চ্যালেঞ্জ ছোড়া হয়েছে। কিন্তু জামাত এতদিন এগুলো অফিসিয়ালি ডিল করেনি।
এখন প্রশ্ন হলো সামনে কী হবে। জামাতের বিবৃতিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে এটা শুধু স্পষ্টিকরণ। প্রতিবাদ বা জবাব শব্দ এখনো ব্যবহার করা হয়নি। তবে সামনে চরমোনাই যদি তাদের মিথ্যাচার অব্যাহত রাখে তাহলে জামাত প্রতিবাদ হিসেবে জবাব দিবে বলে মনে করা হচ্ছে।
একটি বিষয় লক্ষণীয় যে জামাত ইসলাম থেকে দূরে সরে গেছে এই অভিযোগ শুধু চরমোনাইই করছে। মামুনুল হক, আহমদ আব্দুল কাদের সহ দেশের অন্যান্য আলেমরা এমন কথা বলেননি। তাহলে কি শুধু চরমোনাইই সত্য বুঝে আর বাকি সবাই ভুলের মধ্যে আছে? এই প্রশ্ন অনেকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
আরেকটি বিষয়ও উল্লেখ করা দরকার। চরমোনাই এখন বলছে তারা আলেমদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেবে জোটে থাকবে কি থাকবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো জামাতের সাথে এতদিন যে আলাপ আলোচনা হলো, একসাথে যে চলা হলো, তখন তো আলেমদের সাথে পরামর্শ করা হয়নি। এখন বাটোয়ারায় টান পড়েছে বলে পরামর্শের কথা উঠছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে। যদি চরমোনাই জামাত জোটে ফিরে না আসে তাহলে এই নির্বাচনে তাদের অবস্থান কী হবে সেটা দেখার বিষয়। তারা হয়তো নির্বাচন বর্জন করতে পারে অথবা দৃশ্যপট থেকে সরে যেতে পারে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে যেমন চরমোনাইয়ের ছাত্র সংগঠনের কোনো অস্তিত্বই দেখা যায়নি, এই নির্বাচনেও হয়তো সেরকমই হবে।
জামাতের এই আনুষ্ঠানিক বিবৃতি নিঃসন্দেহে চরমোনাইয়ের ব্যাপারে তাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। এতদিন যে সংগঠন নীরব থেকেছে, যা খুশি বলতে দিয়েছে, সেই সংগঠন এখন মুখ খুলেছে। এটা বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলো। সামনের দিনগুলোতে এই সম্পর্ক কোন দিকে যায় সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে সবাইকে।
