
ঢাকার রাজনৈতিক আকাশে এক অদ্ভুত মেঘ জমেছে। যে মেঘের আড়ালে চলছে এক গভীর ষড়যন্ত্রের গন্ধ। দিনের আলোয় যা দেখা যাচ্ছে, রাতের অন্ধকারে তার চেহারা সম্পূর্ণ আলাদা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে বসে যে দাবার চাল দিচ্ছেন, সেই চালের রহস্য এখন আস্তে আস্তে উন্মোচিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছে।
গত কয়েকদিনে যা ঘটেছে, তা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক কার্যক্রম নয়। এটা একটা সুপরিকল্পিত নাটক। যে নাটকের মূল পরিচালক বসে আছেন হাজার হাজার মাইল দূরে। আর এদেশে তার পক্ষে অভিনয় করে যাচ্ছেন কিছু পুতুল চরিত্র। কিন্তু এই নাটক এবার মঞ্চ থেকে নেমে এসেছে জনসমক্ষে। আর সেই কারণেই পুরো দেশ এখন সজাগ হয়ে উঠেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচন কমিশনে গিয়েছিলেন। সেটা সবাই জানে। কিন্তু কেন গিয়েছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসে। তিনি গিয়ে বলে এসেছেন যে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। কিন্তু এই কথার মধ্যে যে বিশাল একটা ফাঁকি আছে, সেটা একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়।
নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম তো এখনো সেভাবে শুরুই হয়নি। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, বাতিল, এসব কাজ করেছে প্রশাসন। জেলা প্রশাসকরা করেছে। রিটার্নিং অফিসাররা করেছে। তাহলে মির্জা ফখরুল প্রশাসনের বিরুদ্ধে কথা না বলে কেন নির্বাচন কমিশনের দিকে আঙুল তুলছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই বের হয়ে আসে আসল মধু কোথায় লুকানো আছে।
প্রশাসনের সিদ্ধান্তে বিএনপির অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে নির্বাচন কমিশনে। আর সেই আপিলে যেন বিএনপির পক্ষে রায় আসে, সেজন্যই এই পুরো নাটকের আয়োজন। মির্জা ফখরুলকে পাঠানো হয়েছে কমিশনের সাথে দেখা করতে। আর সেই দেখা করার ঠিক পরপরই দেখা গেল আব্দুল মিন্টুর মতো বিতর্কিত প্রার্থীর মনোনয়ন ফিরে এসেছে।
আব্দুল মিন্টু কে? এই প্রশ্নের উত্তর জানলে পুরো চিত্রটা আরো স্পষ্ট হয়ে যায়। আব্দুল মিন্টু হলেন সেই ব্যক্তি যার টাকায় বিএনপির রাজনীতি অনেকটাই চলে। তার মনোনয়ন বাতিল মানে শুধু একজন প্রার্থী হারানো নয়। এর মানে হলো দলের তহবিলে টান পড়া। তিনি নিজে নির্বাচনে না দাঁড়াতে পারলে দলকে টাকা দেওয়ার আগ্রহও কমে যাবে। এই কারণেই আব্দুল মিন্টুকে বাঁচানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বিএনপি নেতৃত্ব।
অন্য প্রার্থীদের জন্য এরকম তোড়জোড় দেখা যায়নি। সাধারণ কর্মী বা নেতাদের মনোনয়ন বাতিল হলে কোনো মব নেই, কোনো ঘেরাও নেই। কিন্তু আব্দুল মিন্টুর বেলায় পুরো পরিস্থিতি আলাদা। এটাই প্রমাণ করে যে পুরো বিষয়টা টাকা এবং ক্ষমতার খেলা ছাড়া আর কিছু নয়।
নজরুল ইসলাম খান নামে বিএনপির এক নেতা বলেছেন যে বিভিন্ন কারণে অনেককে বিদেশে যেতে হয়েছে। তাদেরকে নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া উচিত। এই বক্তব্যের মধ্যে একটা স্বীকারোক্তি লুকিয়ে আছে। তারা নিজেরাই মানছেন যে তাদের প্রার্থীদের কাগজপত্রে সমস্যা আছে। দ্বৈত নাগরিকত্বের ইস্যু আছে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান না করে তারা চাইছেন গায়ের জোরে প্রার্থিতা আদায় করতে।
আওয়ামী লীগের ভয়ে বিদেশে যেতে হয়েছে, গুপ্ত থাকতে হয়েছে এই অজুহাত দিয়ে তারা দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ থেকে রেহাই চাইছেন। একই যুক্তিতে ঋণ খেলাপির ক্ষেত্রেও বলবেন যে গত সতেরো বছর গুপ্ত ব্যবসা করতে হয়েছে, তাই ব্যাংকের টাকা দিতে পারেননি। এই ধরনের হাস্যকর যুক্তি দিয়ে তারা আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাতে চাইছেন।
তারেক রহমান বুঝতে পেরেছেন যে অবস্থা খারাপ। সবার চোখের সামনে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রতি প্রকাশ্যে পক্ষপাত করতে পারবে না। নির্বাচনের আগেই তাদের প্রার্থীরা মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। পরাজয়ের আগেই পরাজয় ঘটছে। এই পরিস্থিতি সামলাতে তিনি দুইমুখী কৌশল নিয়েছেন।
একদিকে মির্জা ফখরুলকে পাঠানো হয়েছে নির্বাচন কমিশনে আলোচনা করতে। আরেকদিকে ছাত্রদলকে দিয়ে মব করানো হচ্ছে নির্বাচন কমিশন ভবনের সামনে। এই দুটো কাজ একই সাথে চলছে। কিন্তু মির্জা ফখরুল যখন সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসা করা হয় ছাত্রদল কেন ঘেরাও করছে, তিনি বলেন এটা তারা বলতে পারবে।
এই কথা কি বিশ্বাসযোগ্য? ছাত্রদল ভাত খাবে না রুটি খাবে সেটা পর্যন্ত ঠিক করে দেয় বিএনপি। রুহুল কবির রিজভির বিবৃতিতে সেই নির্দেশ আসে। অথবা সরাসরি তারেক রহমান নির্ধারণ করে দেন। আর নির্বাচন কমিশন ভবনের সামনে কেন বসে আছে সেটা তারা বলতে পারবে? এই ফাজলামি আর কতদিন চলবে?
কিন্তু এই সমস্ত নাটকের বিরুদ্ধে এবার জেগে উঠেছে ছাত্রসমাজ। সাদিক কায়েম, শিবির, ট্যাকসু, সাধারণ ছাত্রসমাজ এমনকি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের একাংশও এই নাটকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এটাই সবচেয়ে বড় খবর এই মুহূর্তে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সেটা আসলে একটা বড় ইস্যু। এই নির্বাচন বন্ধ করতে চাইছে বিএনপি। কারণ তারা জানে এই নির্বাচনে তাদের পরাজয় নিশ্চিত। পরাজয়ের লজ্জা ঢাকতে তারা নির্বাচনই বন্ধ করে দিতে চায়।
সাবি প্রবি কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ সাকু নির্বাচন বিশ জানুয়ারি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটি বিশেষ ছাত্রসংগঠন তাদের মাদার অর্গানাইজেশনের এজেন্ডা বাস্তবায়নে এই নির্বাচন বন্ধের পায়তারা করছে। অর্থাৎ বিএনপির নির্দেশে, তারেক জিয়ার নির্দেশে এই কাজ হচ্ছে।
কিন্তু সাদিক কায়েমসহ ছাত্রসমাজ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তারা বলেছে কোনো দলের শক্তির দাপটে ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধের পায়তারা তারা মানবে না। এটা মানা উচিত কি উচিত না সেই আলোচনা নয়। তারা সরাসরি বলেছে এটা মানবো না।
নির্বাচন কমিশন একবার নির্বাচন বন্ধ করেছিল। বিএনপির চাপে সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু পরে যাচাই-বাছাই করে আবার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। এমনকি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলও রাজি হয়েছে নির্বাচনে অংশ নিতে। কারণ তারা সেখানকার শিক্ষার্থীদের মনোভাব বোঝে।
এখন নির্বাচনের সময় প্রায় এসে গেছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন আবার কি নির্বাচন বন্ধের নির্দেশ দিতে পারে? সেটা করলে আগুন জ্বলবে বাংলাদেশে। সকাল-সন্ধ্যা একেক সময় একেক সিদ্ধান্ত দিলে এই নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে।
সাদিক কায়েমের বার্তা মানে পুরো বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের বার্তা। ছাত্রদলের সাথে এই মুহূর্তে কোনো ছাত্র নেই বললেই চলে। তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে। তাদের মব বা ঘেরাও কর্মসূচি আসলে জনসমর্থনহীন একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।
ছাত্রসমাজ বলেছে তারা জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দেবে। এই ঘোষণা তারেক রহমানের জন্য বড় ধাক্কা। কারণ এতদিন তিনি মনে করতেন ছাত্র রাজনীতি তার নিয়ন্ত্রণে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনুরোধ করা হয়েছে কোনো হুমকি বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করতে। নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। এই দাবি এখন সর্বত্র।
মির্জা ফখরুল এবং তার দল যে বিষয়গুলো উপরে উপরে বলছে, সেগুলোর আড়ালে মূল উদ্দেশ্য একটাই। যদি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন বন্ধ করা যায়, তাহলে তারা খুশি হয়ে বিজয় মিছিল নিয়ে মিষ্টি খেয়ে বাড়ি চলে যাবে। তখন আর কোনো আপত্তি থাকবে না তাদের। এটাই আসল সত্য।
নির্বাচন কমিশনকে এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। মির্জা ফখরুলের সাথে মিটিং হওয়ার পরপরই আব্দুল মিন্টু কীভাবে তার প্রার্থিতা ফিরে পেলেন? এখানে কোনো বিশেষ মেকানিজম কাজ করেছে কিনা সেটা জানার অধিকার জনগণের আছে। জামাত এবং এনসিপিসহ অন্যান্য দল এই বিষয়ে সিরিয়াস হয়েছে।
তারেক রহমানের এই নাটকীয়তা কাজ করছে না। তার রাজনীতি বিএনপির ভেতরেই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নির্বাচনে রাজি হয়ে গেছে। এর মানে তারেক রহমানের নির্দেশ তারা মানছে না।
দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানানো হচ্ছে বিএনপির এই নাটকের বিরুদ্ধে সচেতন থাকতে। গণতন্ত্র রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কোনো দলের স্বার্থে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে জিম্মি করা যাবে না।
ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস বলে এদেশে ছাত্রদের সাথে কেউ খেলতে পারে না। জুলাই বিপ্লবের স্মৃতি এখনো তাজা। সেই শক্তি এখনো সক্রিয়। তারেক রহমান যদি মনে করেন লন্ডনে বসে দূরনিয়ন্ত্রণে দেশের রাজনীতি চালাবেন, তাহলে তিনি ভুল করছেন।
আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরো স্পষ্ট হবে। নির্বাচন কমিশন কার পক্ষে দাঁড়ায় সেটা দেখার বিষয়। জনগণ সজাগ আছে। ছাত্রসমাজ প্রস্তুত আছে। বিএনপির এই নাটক শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে বলেই মনে হচ্ছে
