
রাজনীতির মাঠে কখনো কখনো এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা সত্যিই অভাবনীয়। একসময় যারা একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে একই স্বপ্ন দেখেছিল, একই শ্লোগান দিয়েছিল, আজ তারাই পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এমন তীব্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে যার পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা এখনো কেউ বলতে পারছে না।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ যখন একই জোটে ছিল তখন অনেকেই ভেবেছিল এই ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী হবে। কিন্তু রাজনীতির অঙ্কে এমন কিছু সমীকরণ থাকে যা হঠাৎ করেই সব হিসাব উল্টে দেয়। আর ঠিক সেটাই ঘটেছে এবার। চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে এই দুই দল। যে জোট গড়তে মাসের পর মাস আলোচনা হয়েছিল, যে জোটকে ঘিরে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে অসীম উৎসাহ ছিল, সেই জোট এখন ইতিহাসের পাতায় একটি ব্যর্থ অধ্যায় হিসেবে লেখা হয়ে যাচ্ছে।
জোট ভাঙনের খবর প্রকাশিত হওয়ার পরপরই যা ঘটলো তা দেখে অনেকেই হতভম্ব হয়ে গেলেন। দুই দলের অ্যাক্টিভিস্টরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনায় মেতে উঠলেন। যে হাত একদিন করমর্দন করেছিল সেই হাত এখন আঙুল তুলছে। যে মুখ একদিন প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল সেই মুখ এখন কটু বাক্য উচ্চারণ করছে। রাজনীতির এই নির্মম বাস্তবতা দেখে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে না এই দ্বন্দ্ব আসলে কতদূর গড়াবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই জোট ভাঙনের পেছনে আসল কারণটা কী? কেন হঠাৎ করে এতদিনের সম্পর্কে চিড় ধরলো? কেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এগারো দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে যে তথ্য সামনে আসছে তা রীতিমতো চমকপ্রদ।
সূত্রের খবর অনুযায়ী জানা গিয়েছে যে এই জোট ভাঙনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে ঢাকা-১১ আসন। হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন। একটি মাত্র আসনকে কেন্দ্র করে এত বড় একটি জোটে ভাঙন ধরেছে। কিন্তু যারা রাজনীতি বোঝেন তারা জানেন একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন কখনো কখনো পুরো সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
ঢাকা-১১ আসনটি নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রয়েছে সুদীর্ঘ পরিকল্পনা। এই আসনে তাদের প্রার্থী হলেন দলের যুগ্ম মহাসচিব শেখ ফজলে বারি মাসুদ। শুধু যুগ্ম মহাসচিব বললে তাঁর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। অর্থাৎ রাজধানীর উত্তর অংশে তাঁর রয়েছে বিশাল প্রভাব এবং সাংগঠনিক শক্তি। বছরের পর বছর ধরে এই এলাকায় কাজ করে তিনি গড়ে তুলেছেন এমন একটি ভোট ব্যাংক যা যেকোনো নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
এবার একটু পেছনে ফিরে যাওয়া যাক। এগারো দলীয় জোট যখন আট দলীয় জোট ছিল তখন এই আসন নিয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা-১১ আসনে নির্বাচন করবেন শেখ ফজলে বারি মাসুদ। এই সিদ্ধান্তে সকলেই সম্মত ছিলেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ধরেই নিয়েছিল এই আসনটি তাদের। শেখ ফজলে বারি মাসুদও নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেছিলেন। এলাকায় তাঁর গণসংযোগ বাড়ছিল এবং মানুষের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
কিন্তু এরপরই ঘটলো সেই ঘটনা যা পুরো সমীকরণ উল্টে দিল। এনসিপি তথা ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি এই জোটে যুক্ত হলো। আর এনসিপি যুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেল আসন বণ্টনের হিসাব। জামায়াতে ইসলামী ঢাকা-১১ আসনটি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে দিয়ে দিল। যে আসন এতদিন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দখলে ছিল বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সেই আসন এক লহমায় চলে গেল অন্যের হাতে।
এখানে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি উঠছে তা হলো এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাথে কোনো আলোচনা হয়েছিল? সূত্র জানাচ্ছে উত্তর হচ্ছে না। কোনো ধরনের সমঝোতামূলক আলোচনা করা হয়নি। যে দলটি এতদিন এই আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তাদের সাথে একবারও কথা না বলেই তাদের হাত থেকে এই আসন কেড়ে নেওয়া হলো। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এই ক্ষোভ কতটা গভীর ছিল তা বোঝা যায় পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ থেকে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। এবং এখন জোট থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর তারা ঢাকা-১১ আসনকে দিচ্ছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। শেখ ফজলে বারি মাসুদ এখন স্বতন্ত্রভাবে এই আসনে লড়বেন এবং তিনি জামায়াত জোটের প্রার্থী নাহিদ ইসলামকে এক প্রকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
এই পরিস্থিতি জামায়াত জোটের জন্য কতটা উদ্বেগজনক তা বুঝতে হলে নাহিদ ইসলামের গুরুত্ব বুঝতে হবে। নাহিদ ইসলাম কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নেতা নন। তিনি গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নায়ক। জুলাই বিপ্লবে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। সেই সময় সারা দেশের মানুষ তাঁর নাম জেনেছে এবং তাঁকে একজন সাহসী তরুণ নেতা হিসেবে চিনেছে। তাঁর জনপ্রিয়তা এখনো তুঙ্গে রয়েছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা আর নির্বাচনে জেতা সবসময় এক কথা নয়।
জামায়াত জোটের জন্য নাহিদ ইসলামকে সংসদে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ তিনি শুধু একজন প্রার্থী নন তিনি এই জোটের মুখ। তাঁর জয় মানে জোটের প্রতীকী বিজয়। তাঁর পরাজয় মানে জোটের জন্য বিশাল এক ধাক্কা। সেই কারণেই ঢাকা-১১ আসন এখন শুধু একটি আসন নয় এটি এখন জামায়াত জোটের সম্মান ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই আসনে নাহিদ ইসলাম এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গিয়েছেন। যদি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাথে জামায়াতের সমঝোতা হতো তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। শেখ ফজলে বারি মাসুদের ভোট ব্যাংক তখন নাহিদ ইসলামের পক্ষে কাজ করত। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা তাঁর হয়ে মাঠে নামত। কিন্তু এখন সেই সম্ভাবনা সম্পূর্ণ শেষ। বরং যে ভোট তাঁর পক্ষে যেতে পারত সেই ভোট এখন তাঁর বিপক্ষে যাবে।
এই আসনে জটিলতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বিএনপির প্রার্থী এমএ কাইয়ুমের উপস্থিতি। এমএ কাইয়ুম এই এলাকায় বেশ ভালো প্রভাব বিস্তার করে আছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় রাজনীতি করে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ভোট ব্যাংক। তাঁর সমর্থকরা এলাকায় সক্রিয় এবং তারা জানে কীভাবে ভোট সংগ্রহ করতে হয়। বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিও এই এলাকায় বেশ শক্তিশালী।
এখন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে এই রকম। একদিকে জামায়াত জোটের নাহিদ ইসলাম যিনি গণঅভ্যুত্থানের নায়ক হিসেবে জনপ্রিয় কিন্তু এলাকায় তাঁর সাংগঠনিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। অন্যদিকে বিএনপির এমএ কাইয়ুম যার রয়েছে এলাকায় দীর্ঘদিনের পরিচিতি এবং নিজস্ব ভোট ব্যাংক। আর মাঝখানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ ফজলে বারি মাসুদ যিনি এখন জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে রণক্ষেত্রে নেমে পড়েছেন।
এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে কে জিতবে তা এখনই বলা কঠিন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন জামায়াত এবং চরমোনাইয়ের এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লাভবান করতে পারে বিএনপির প্রার্থী এমএ কাইয়ুমকে। কারণ ইসলামপন্থী ভোট যদি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় তাহলে সেই সুযোগে এগিয়ে যেতে পারেন তিনি।
এই সম্ভাবনা জামায়াত জোটের নেতাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তারা বুঝতে পারছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে নিয়ে তারা যে ভুল করেছে তার মাশুল এখন গুনতে হতে পারে। আসন বণ্টনে যে তাড়াহুড়ো করা হয়েছে যে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তার ফলাফল এখন তাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। জোট ভেঙে গিয়েছে এবং দুই দল এখন পরস্পরের প্রতিপক্ষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিদিন দুই দলের কর্মীরা একে অপরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছে। যে ঐক্য একদিন এত সম্ভাবনাময় ছিল সেই ঐক্য এখন তিক্ত স্মৃতি।
প্রশ্ন হচ্ছে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো পথ আছে কি না। কেউ কেউ মনে করছেন এখনো সময় আছে। দুই দল যদি আবার আলোচনায় বসে তাহলে হয়তো কোনো সমাধান বের হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে দুই পক্ষের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে তা কি এত সহজে দূর হবে? শেখ ফজলে বারি মাসুদ কি এত সহজে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন? জামায়াত কি এত সহজে নাহিদ ইসলামের পরিবর্তে অন্য কাউকে প্রার্থী করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা।
এদিকে ভোটের দিন এগিয়ে আসছে। সময় কমে যাচ্ছে। এবং ঢাকা-১১ আসনের রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে দিনকে দিন। এই আসনে কী ঘটবে তা নিয়ে সবাই এখন উৎকণ্ঠিত। নাহিদ ইসলাম কি পারবেন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে? শেখ ফজলে বারি মাসুদ কি পারবেন জামায়াত জোটের ঘুম কেড়ে নিতে? নাকি শেষ পর্যন্ত এই দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে জিতে যাবেন বিএনপির এমএ কাইয়ুম?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সময়ই দিতে পারবে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট। রাজনীতিতে ছোট ভুলও কখনো কখনো বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। জামায়াত জোট যে ভুল করেছে তার মূল্য হয়তো তাদের চড়া দামে দিতে হবে। আর সেই মূল্য দেওয়ার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে ঢাকা-১১ আসন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন এই ঘটনা থেকে সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত। জোট রাজনীতিতে সবার মতামত গুরুত্বপূর্ণ। একতরফা সিদ্ধান্ত নিলে তার ফল কখনোই ভালো হয় না। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাথে যদি আলোচনা করা হতো যদি তাদের মতামত নেওয়া হতো তাহলে হয়তো আজ এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না কাউকেই।
কিন্তু ইতিহাস যদি দিয়ে লেখা যায় না। যা হয়ে গিয়েছে তা আর ফেরানো সম্ভব নয়। এখন সবাইকে মুখোমুখি হতে হবে বাস্তবতার। এবং সেই বাস্তবতা হচ্ছে ঢাকা-১১ আসনে একটি তীব্র প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অপেক্ষা করছে। এই নির্বাচনে কে জিতবে তা নির্ধারণ করবে ভোটাররা। আর সেই রায় আসার আগে পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে উৎকণ্ঠায়।
এই মুহূর্তে যা স্পষ্ট তা হলো জামায়াত এবং চরমোনাইয়ের এই দ্বন্দ্ব শুধু দুটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন পুরো ইসলামপন্থী রাজনীতির জন্যই একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে ঐক্য দরকার ছিল সেই ঐক্য আর নেই। যে সমন্বয় প্রয়োজন ছিল সেই সমন্বয় এখন অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে ইসলামপন্থী রাজনীতি কোন দিকে যাবে তা নিয়ে সবার মধ্যেই রয়েছে গভীর উদ্বেগ।
আগামী দিনগুলোতে এই পরিস্থিতি কীভাবে এগোয় তা দেখার জন্য সকলের চোখ এখন ঢাকা-১১ আসনের দিকে। এই আসনের ফলাফল হয়তো অনেক কিছুই নির্ধারণ করে দেবে। শুধু তিন প্রার্থীর ভাগ্য নয় হয়তো পুরো জামায়াত জোটের ভবিষ্যৎও।
