
রাজনীতির মাঠে কখনো কখনো এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যার পরিণতি বুঝতে বছরের পর বছর লেগে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একটি ঘটনা ঘটে গেল যেখানে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে একটি রাজনৈতিক দল তাদের সিদ্ধান্তের ভয়াবহ পরিণতি অক্ষরে অক্ষরে অনুভব করতে শুরু করেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, যাকে সাধারণভাবে চরমোনাই নামে চেনে সবাই, জামাত জোট থেকে বের হওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিল তার প্রভাব এত দ্রুত তাদের উপর পড়বে এটা হয়তো তারা নিজেরাও কল্পনা করতে পারেনি।
গত সতেরো জানুয়ারি বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে যখন চরমোনাই আনুষ্ঠানিকভাবে জামাত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বের হওয়ার ঘোষণা দিল, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এটা হয়তো একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। হয়তো দর কষাকষির জন্য এই সিদ্ধান্ত। হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই আবার সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা যে কতটা নির্মম হতে পারে সেটা বুঝতে চরমোনাইকে বেশি সময় নিতে হয়নি। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা পার না হতেই তাদের ভেতর থেকে ভাঙন শুরু হয়ে গেছে এবং এই ভাঙনের গতি এতটাই তীব্র যে এটা থামানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আমার দেশ পত্রিকা যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে সেটা দেখলে বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। দুপুর দুইটা বাজার আগেই অর্থাৎ জোট ত্যাগের চব্বিশ ঘণ্টা পূর্ণ হওয়ার আগেই ইসলামী আন্দোলনের দশজন নেতাকর্মী জামাতে যোগদান করেছেন। এই দশজনের তালিকায় রয়েছেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের পঁচাত্তর নম্বর ওয়ার্ড দাসের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সভাপতি সহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। এদের মধ্যে গাজী নাসরুদ্দিন, কাজী আক্তার হোসেন যিনি একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং কাজী খালেদ হোসেনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এখানে একটা বিষয় খুব ভালো করে বুঝতে হবে। যারা দল ত্যাগ করে জামাতে যোগ দিয়েছেন এরা কিন্তু গ্রামের কোনো প্রান্তিক পর্যায়ের মুরিদ নন। এরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানুষ। এদের একটা সামাজিক পরিচিতি আছে। এরা বোঝেন রাজনীতি কী জিনিস। এরা বোঝেন ক্ষমতার হিসাব নিকাশ। এবং ঠিক এই কারণেই তারা বুঝতে পেরেছেন যে জামাত জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে চরমোনাই আসলে নির্বাচনী রেস থেকে কার্যত ছিটকে পড়েছে। আর এই উপলব্ধি থেকেই তারা দল ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শনিবার সকালে রাজধানীর দাসেরকান্দি এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই যোগদান সম্পন্ন হয়। জোট ছাড়ার ঘোষণার মাত্র উনিশ থেকে বিশ ঘণ্টার মধ্যেই এই ঘটনা ঘটে গেছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামাতে ইসলামীর মনোনীত ঢাকার নয় আসনের সংসদ প্রার্থী এবং শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কোভিদ আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন খিলগাঁও পূর্ব থানা জামাতের আমির মাওলানা মাহমুদুর রহমান। এই সময় উপস্থিত নেতারা নবাগত নেতাকর্মীদের স্বাগত জানান এবং সংগঠনের আদর্শ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তাদের হাতে তুলে ধরেন।
কিন্তু এই দশজনের গল্প তো শুধু শুরু। পত্রিকায় যে খবর আসে সেটা তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। বাস্তবে যা ঘটছে তার পরিধি আরো অনেক বড়। কারণ রাজনীতিতে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। যখন দশজন প্রকাশ্যে দল ত্যাগ করে তখন বুঝতে হবে নীরবে নিভৃতে আরো দশ হাজার মানুষ একই পথে হাঁটছে। সবাই পত্রিকায় নাম আসতে চায় না। সবাই সেই দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্যে পড়তে চায় না। তাই তারা চুপচাপ একদল থেকে আরেক দলে চলে যায়। এই সংখ্যাটা আসলে অনেক বেশি এবং এটাই চরমোনাইয়ের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে চরমোনাই এই ভুলটা কেন করলো? তাদের কি বোঝা উচিত ছিল না যে জোট ত্যাগ করলে এই পরিণতি হবে? আসলে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। জামাত যখন তাদের জোটের জন্য আসন বরাদ্দ নির্ধারণ করছিল তখন তারা একটা র্যাশনালিটি অনুসরণ করছিল। তারা দেখছিল কোন দলের জনভিত্তি কতটা। কোন দল কতটা আসন জেতার সক্ষমতা রাখে। এই হিসাব অনুযায়ী চরমোনাইয়ের জন্য যে আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছিল সেটা হয়তো চরমোনাইয়ের নেতৃত্বের প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেই আসন বরাদ্দ মেনে নিয়ে জোটে থাকাটাই কি বুদ্ধিমানের কাজ ছিল না?
চরমোনাইয়ের মধ্যে যারা রাজনীতি বোঝেন যাদের শুভবুদ্ধি আছে যারা শুধু আবেগ দিয়ে নয় বরং যুক্তি দিয়ে চিন্তা করেন তারা কিন্তু এই বিষয়টা আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন। তারা জানতেন যে জোট ত্যাগ করলে কী হবে। এবং এখন যা ঘটছে সেটা দেখে তাদের সেই আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। জামাত জোট থেকে বের হওয়ার মধ্য দিয়ে চরমোনাই কার্যত নির্বাচনী রেস থেকে ছিটকে পড়েছে। এবং শুধু নির্বাচনী রেস থেকে নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারা অন্তত বারোই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে যদি না তারা জোটে ফিরে আসে।
এই অপ্রাসঙ্গিকতার বিষয়টা বুঝতে হলে একটু অতীতের দিকে তাকাতে হবে। মনে আছে ডাকসু নির্বাচনের কথা? জোকসু নির্বাচনের কথা? সর্বশেষ জোকসু নির্বাচনে কী হয়েছিল? শিবির ছাত্র অধিকার পরিষদ এবং অন্যান্য প্যানেল নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা হয়েছিল। সবাই জানতে চাইছিল কে কোথায় কতটা ভোট পাচ্ছে। কিন্তু চরমোনাইয়ের কোনো প্যানেল ছিল কিনা সেটা কি কেউ একবারও শুনেছেন? কেউ কি একবারও এই নিয়ে আলোচনা করতে দেখেছেন? উত্তর হচ্ছে না। কারণ তারা ছিল আলোচনার বাইরে। তারা ছিল অপ্রাসঙ্গিক।
ঠিক এই একই পরিণতি এখন তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। জামাত জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণে আগামী দিনগুলোতে আপনি দেখবেন নির্বাচনী রেস নিয়ে যত আলোচনা হবে সেখানে চরমোনাই নামের কোনো দলের উল্লেখ থাকবে না। কোনো জরিপে তাদের নাম আসবে না। কোনো বিশ্লেষণে তাদের কথা বলা হবে না। কারণ তারা এখন রেসে নেই। তারা নিজেরাই নিজেদের রেস থেকে বের করে দিয়েছে।
এই বাস্তবতা চরমোনাইয়ের যারা রাজনীতি বোঝেন তারা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন। এবং এই কারণেই তাদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। অনেকে দল ত্যাগ করছেন। অনেকে প্রকাশ্যে বলছেন যে এই সিদ্ধান্ত ঠিক হচ্ছে না। এবং অনেকে আবার দলের ভেতর থেকে জোটে ফিরে আসার জন্য নানা চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই তথ্য একদম নিশ্চিতভাবে জানা।
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। চরমোনাইয়ের মধ্যে দুইটা ধারা আছে। এই দুই ধারার মানসিকতা সম্পূর্ণ আলাদা। প্রথম ধারা হচ্ছে যাদের আমরা বলি খাঁটি মুরিদ। এরা হচ্ছে সেই মানুষগুলো যাদের কাছে চরমোনাই একটা আধ্যাত্মিক সম্পর্কের নাম। তাদের কাছে রাজনীতি গৌণ। তাদের কাছে মূল বিষয় হচ্ছে তাদের পীর সাহেবের সাথে সম্পর্ক। চরমোনাই যদি আজ রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে দেয় তারপরেও এই মানুষগুলো চরমোনাইয়ের মুরিদ থাকবে। তারা বলবে আমি চরমোনাইয়ের মুরিদ আর কিছু জানি না।
কিন্তু আরেকটা ধারা আছে। এই ধারার মানুষগুলো মূলত রাজনৈতিক সচেতন। এদের মধ্যে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে উঠে এসেছে। এদের অনেকে হয়তো শিবির থেকে এসেছে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। এদের কাছে ইসলামী আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ঠিকই। কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ক্ষমতায় আসার যৌক্তিকতা। তারা মনে করে রাজনীতি মানে শুধু আদর্শ প্রচার নয়। রাজনীতি মানে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা। আপনি যদি ক্ষমতাকেন্দ্রিক তৎপরতায় ব্যর্থ হন তাহলে আপনি ব্যর্থ। আপনার দল করার কোনো প্রয়োজন নেই।
এই দ্বিতীয় ধারার মানুষগুলোর মধ্যেই এখন সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। কারণ তারা দেখছে যে এত বছর ধরে রাজনীতি করে নির্বাচনে অংশ নিয়ে একটা আসনও জেতা যায়নি। এবার যদি নির্বাচনে একটা আসন জেতার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা না যায় তাহলে আর মান সম্মান কিছুই থাকবে না। এই উপলব্ধি থেকেই তারা চিন্তা করছে যে এই দলে থেকে আর কোনো লাভ নেই। বাংলাদেশে ইসলামী দল তো অনেক আছে। অন্য কোথাও গিয়ে কাজ করা যাবে।
এই মানসিকতা থেকেই দল ত্যাগের ঘটনা ঘটছে। এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে সামনে এরকম আরো অনেক ঘটনা দেখা যাবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে জামাতের কী করা উচিত? জামাতের কি চরমোনাইকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের জোটের মূল তত্ত্ব বুঝতে হবে। জোট কেন হয়? জোট হয় কমন ইন্টারেস্টের জন্য। জোট হয় কমন এনিমির বিরুদ্ধে। শরীয়তের দৃষ্টিতে যাকে বলে মাসলাহাতে মুরসালা সেই বিবেচনায় জোট হয়। তুলনামূলকভাবে কে বেশি ভালো আর কে বেশি খারাপ সেই হিসাব থেকে জোট হয়।
যুক্তিটা খুব সহজ। আপনি যদি একা একা জিততে পারেন তাহলে তো ঠিক আছে। কিন্তু যদি না পারেন তাহলে আপনাকে হিসাব করতে হবে। যাকে হারাতে চান সে যদি বেশি খারাপ হয় তাহলে তুলনামূলক কম খারাপকে সাথে নিয়ে তাকে হারাতে হবে। এটাই হচ্ছে জোটের থিওরি। এটাই হচ্ছে শরীয়তে জোটের উসুল।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চরমোনাইকে জোটে রাখতে পারলে ভালো। এবং রাখার চেষ্টা করা উচিত। এমনকি যদি কেউ সকাল সন্ধ্যা চরমোনাইয়ের সমালোচনা করে তারপরেও এই কথাই বলতে হবে যে চরমোনাইকে জোটে রাখার চেষ্টা করা দরকার।
জামাতের অনেকে বলেন যে চরমোনাইয়ে এই সমস্যা সেই সমস্যা। কিন্তু এই যুক্তি তো ধোপে টেকে না। কারণ চরমোনাইয়ে যদি কোনো সমস্যা না থাকতো তাহলে তো তারা জামাতেই থাকতো। সমস্যা আছে বলেই তো আলাদা দুটো দল। চরমোনাইয়ের দৃষ্টিতে জামাতে সমস্যা আছে। জামাতের দৃষ্টিতে চরমোনাইয়ে সমস্যা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বিএনপির চেয়ে কি চরমোনাইয়ে বেশি সমস্যা?
এই প্রশ্নটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির সাথে জামাতের জোট ছিল। বিএনপি কি চরমোনাইয়ের চেয়ে ভালো? চরমোনাইয়ে হাজারো দোষ থাকতে পারে। কেউ বলতে পারে এই সমস্যা সেই সমস্যা। কিন্তু বিএনপির চেয়ে চরমোনাই খারাপ এই কথা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
কেউ কেউ বলেন চরমোনাইয়ে রয়ের এজেন্ট আছে। ঠিক আছে ধরে নেওয়া যাক এই অভিযোগ সত্য। কিন্তু চরমোনাইয়ে যদি দশজন রয়ের এজেন্ট থাকে তাহলে বিএনপিতে আছে দশ হাজার। তারপরেও তো জোট হয়েছিল। কারণ জোটে ভালো খারাপ ত্রুটি বিচ্যুতির ঊর্ধ্বে এই বিবেচনা চলে না। জোট হয় বৃহত্তর স্বার্থে। জোট হয় সাধারণ শত্রুকে পরাজিত করার জন্য।
এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বলা যায় যে শত আপত্তি সত্ত্বেও চরমোনাইয়ের ত্রুটি বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও জোটে তাদের ফিরিয়ে আনার জোরালো চেষ্টা করা দরকার। এবং প্রয়োজনে জামাতের উচিত তাদের আরেকটু ছাড় দেওয়া। এই বিষয়ে কোনো দ্বিমত থাকার কথা নয়।
কিন্তু চরমোনাই যে ভুল করেছে সেটা তারা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। এবং এই টের পাওয়াটা শুরু হয়েছে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই। জোট ছাড়ার ঘোষণার পর চব্বিশ ঘণ্টা পূর্ণ হতে না হতেই খবর আসা শুরু হয়েছে। দল ভাঙছে। নেতারা চলে যাচ্ছে। এবং এই প্রক্রিয়া শুধু থামছে না বরং গতি পাচ্ছে।
এখানে একজন ব্যক্তির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। তার নাম এই মুহূর্তে জানা নেই। কিন্তু তার ভিডিও মাঝে মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়। তিনি চরমোনাইয়ের একজন পরিচিত মুখ। সুন্দর করে কথা বলেন। চরমোনাইয়ের প্রচার করেন। জামাতের সমালোচনা করেন। এটাই মূলত তার রোল।
কিন্তু এই মানুষটিও এখন যৌক্তিক কথা বলছেন। তিনি একটা ভিডিও দিয়েছেন যেখানে তিনি বলছেন ইসলামী দলগুলো এত আসন চায় কেন? দেশে এখন রাজনীতির বাস্তবতা কী? ধানের শীষ দাঁড়িপাল্লা জামাত এগুলো এখন আলাদা একটা সিগনিফিকেন্স তৈরি করেছে। জামাত যতগুলো আসনে নির্বাচন করবে তাদের অনেকগুলোতে জেতার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু চরমোনাই সহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলো সবাই মিলে কি দশটা আসন জিততে পারবে?
তিনি অনেকগুলো যুক্তি দিয়েছেন। এবং সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে তিনি তার ভিডিওতে ক্যাপশন দিয়েছেন এভাবে যে কেউ দালাল বললে বলুন কিন্তু আমি দালাল নই আমি সঠিক কথা বলছি। এই ক্যাপশন থেকেই বোঝা যায় তিনি কতটা চাপের মধ্যে আছেন। তিনি জানেন তার এই কথা বলার জন্য অনেকে তাকে দালাল বলবে। কিন্তু তারপরেও তিনি সত্য কথা বলছেন।
একইভাবে রেজাউল করিম আবরার সাহেবও যথেষ্ট ব্যালেন্সড কথা বলেছেন। তিনিও মনে করেন যে এই সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। এরকম আরো অনেকেই আছেন যারা প্রকাশ্যে বা গোপনে এই মত পোষণ করছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই মানুষগুলো দল ছাড়ছে? কেন তারা জামাতে যোগ দিচ্ছে? উত্তর হচ্ছে তারা বুঝতে পেরেছে যে চরমোনাই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রেস থেকে নির্বাচনী তৎপরতা থেকে কার্যত ছিটকে পড়েছে। এই উপলব্ধি থেকেই তারা দল ত্যাগ করেছে। এটা চরমোনাইয়ের জন্য একটা বড় ধাক্কা। এবং সামনে এরকম আরো অনেক ঘটনা দেখা যাবে এটা প্রায় নিশ্চিত।
এখানে আরেকটা বিষয় বলা দরকার। বাংলাদেশে এখন রাজনীতির মাঠে কী দৃশ্য দেখা যাচ্ছে? ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লা এই দুটো প্রতীক এখন আলাদা একটা গুরুত্ব পেয়েছে। জোয়ার দাঁড়িপাল্লা জামাত এই নামগুলো এখন প্রতিটি আলোচনায় আসছে। মানুষ এখন জানতে চাইছে জামাত কোন আসনে প্রার্থী দিচ্ছে। জোট কোথায় কতটা শক্তিশালী। এই আলোচনায় চরমোনাইয়ের নাম কোথায়?
উত্তর হচ্ছে কোথাও না। কারণ তারা এখন রেসে নেই। তারা নিজেরাই নিজেদের বের করে দিয়েছে। এবং এটা বুঝতে পারছে তাদের রাজনীতি সচেতন নেতাকর্মীরা। ঠিক এই কারণেই তারা দল ছাড়ছে।
জামাতের অনেকে হয়তো এই ঘটনায় খুশি হচ্ছেন। তারা ভাবছেন চরমোনাই থেকে লোক আসছে এটা তো ভালো। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে চরমোনাইকে জোটে ফিরিয়ে আনা। কারণ বৃহত্তর ইসলামী ঐক্যের স্বার্থে এটা জরুরি।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যা ঘটছে সেটা ঐতিহাসিক। একটা গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ একটা নতুন দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে ইসলামী শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকা দরকার। পারস্পরিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে সেগুলো পাশে রেখে একসাথে কাজ করা দরকার।
চরমোনাই যে ভুল করেছে সেটা তারা বুঝতে পেরেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তারা কি এই ভুল শোধরাবে? তারা কি জোটে ফিরে আসবে? নাকি তারা এই পথেই এগিয়ে যাবে এবং ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে?
এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে চরমোনাইয়ের ভেতর থেকেই জোটে ফেরার চাপ তৈরি হচ্ছে। কারণ তাদের রাজনীতি সচেতন নেতাকর্মীরা বুঝতে পারছেন যে এই পথে গেলে শেষ পর্যন্ত কিছুই অর্জন হবে না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনা একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে। কোনো দল যখন জোট থেকে বের হয় তখন তার পরিণতি কী হতে পারে সেটা চরমোনাইয়ের এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যাবে। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় যে ভাঙন শুরু হয়েছে সেটা থামবে কিনা সেটা দেখার বিষয়।
আগামী দিনগুলোতে আরো অনেক খবর আসবে। আরো অনেক নেতা দল ছাড়বে। হয়তো কেউ কেউ প্রকাশ্যে আসবে হয়তো কেউ কেউ নীরবে চলে যাবে। কিন্তু মূল বিষয়টা হচ্ছে চরমোনাই এখন একটা সংকটের মধ্যে পড়েছে। এই সংকট থেকে বের হতে হলে তাদের জোটে ফিরতে হবে। অন্য কোনো পথ নেই।
বারোই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। তার আগে যদি চরমোনাই জোটে ফিরে না আসে তাহলে তারা এই নির্বাচনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। তারা থাকবে আলোচনার বাইরে। কোনো জরিপে তাদের নাম আসবে না। কোনো বিশ্লেষণে তাদের কথা বলা হবে না। এটা তাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক পরিস্থিতি হবে।
এই পরিস্থিতি এড়াতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অহংকার ত্যাগ করতে হবে। প্রয়োজনে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। এবং বৃহত্তর ইসলামী ঐক্যের স্বার্থে জোটে ফিরে আসতে হবে।
জামাতেরও উচিত এই ব্যাপারে উদার হওয়া। চরমোনাইকে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করা। প্রয়োজনে তাদের আরেকটু বেশি আসন দেওয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে ইসলামী শক্তিগুলোর ঐক্য। এই ঐক্য যদি ভেঙে যায় তাহলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আশা করা যায় আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই সমস্যার একটা সমাধান হবে। চরমোনাই জোটে ফিরে আসবে। এবং সবাই মিলে একসাথে নির্বাচনে অংশ নেবে। কিন্তু যদি তা না হয় তাহলে চরমোনাইয়ের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হবে। তাদের থেকে আরো মানুষ চলে যাবে। এবং তারা ধীরে ধীরে একটা অপ্রাসঙ্গিক দলে পরিণত হবে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। একটা গণঅভ্যুত্থানের পর দেশ একটা ক্রান্তিকালের মধ্যে আছে। এই সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটা ভুল সিদ্ধান্ত অনেক বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। চরমোনাইয়ের এই অভিজ্ঞতা সেই সত্যের প্রমাণ।
আগামী দিনগুলোতে কী ঘটে সেটা দেখার বিষয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে চরমোনাই একটা বড় সমস্যার মধ্যে পড়েছে। এই সমস্যা থেকে বের হতে হলে তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় যা ঘটেছে সেটা একটা সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তা যদি চরমোনাইয়ের নেতৃত্ব বুঝতে পারেন তাহলে হয়তো এখনো সময় আছে। কিন্তু যদি তারা অহংকারে স্থির থাকেন তাহলে তাদের জন্য সামনে আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির ইতিহাসে এই ঘটনা একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। জোট রাজনীতির সুবিধা এবং জোট ত্যাগের অসুবিধা এই দুটো বিষয় চরমোনাইয়ের এই অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে যে কোনো দল এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চরমোনাইয়ের এই উদাহরণ মনে রাখবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সমস্যার সমাধান করা। চরমোনাইকে জোটে ফিরিয়ে আনা। এবং সবাই মিলে একসাথে আগামী দিনের জন্য কাজ করা। এটাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। এটাই হবে ইসলামী আন্দোলনের জন্য সবচেয়ে ভালো।
আশা করা যায় সংশ্লিষ্ট সবাই এই বিষয়টা বুঝবেন এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্ধারণে এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি। পারস্পরিক মতপার্থক্য পাশে রেখে বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করা দরকার। এটাই হবে প্রকৃত রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়।
চরমোনাইয়ের এই সংকট থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার সবার। জোট রাজনীতিতে অহংকারের কোনো স্থান নেই। ছাড় দেওয়া শিখতে হয়। বৃহত্তর স্বার্থে ছোট ছোট বিষয় ত্যাগ করতে হয়। এই সত্যটা যত তাড়াতাড়ি সবাই বুঝবে ততই মঙ্গল।
আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় সেটা সবাই দেখবে। কিন্তু এই মুহূর্তে যা ঘটছে সেটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় একটা দলের এত বড় ভাঙন শুরু হওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল ঘটনা। এই ঘটনা প্রমাণ করছে যে চরমোনাইয়ের জোট ত্যাগের সিদ্ধান্ত কতটা ভুল ছিল।
এখন দেখার বিষয় তারা এই ভুল শোধরাতে কতটা দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। সময় বেশি নেই। বারোই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। তার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় পরিণতি আরো ভয়াবহ হবে।
