ইতিহাস কখনো কখনো এমনভাবে ফিরে আসে যে মানুষ চিনতেই পারে না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে যখন রক্তের বন্যা বইছিল, যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছিল, যখন মানবতা পদদলিত হচ্ছিল প্রতিটি মুহূর্তে, তখন কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়ের এলিয়ট ট্রুডো এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে চেয়েছিলেন। বর্তমান কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর পিতা সেই মানুষটি চেয়েছিলেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক সমালোচনা করতে, কানাডার অবস্থান পরিবর্তন করতে। কিন্তু পারেননি। কেন পারেননি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটি নামই বারবার সামনে আসে। সেই নাম যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন সরাসরি পাকিস্তানকে সমর্থন দিচ্ছিল সেই সময়। একজন মানবতাবাদী নেতা হয়েও ট্রুডো কিছু করতে পারলেন না। সেই হতাশা থেকে তিনি একটি কথা বলেছিলেন যা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, যদি আপনার সঙ্গী হয় একটি বিশাল হাতি আর আপনি হন ক্ষুদ্র একটি খরগোশ, তাহলে রাতে তার পাশে ঘুমানোটাও বিপজ্জনক। কারণ হাতির সামান্য নড়াচড়াও আপনার প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।
আজ থেকে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পরে সেই একই দৃশ্য যেন আবার ফিরে এসেছে। তবে এবার ভুক্তভোগী বাংলাদেশ নয়। এবার সেই হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট হতে চলেছে স্বয়ং ইউরোপ। যে ইউরোপ দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করেছে, যাদের কষ্টার্জিত অর্থ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার প্রতিবছর চলে গেছে আমেরিকার পকেটে সিকিউরিটি মানি হিসেবে, যারা নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়ানোর বদলে নির্ভর করেছে ওয়াশিংটনের ছত্রছায়ায়, আজ তারাই আবিষ্কার করছে যে রক্ষক কখন ভক্ষক হয়ে গেছে তারা টেরও পায়নি।
গ্রীনল্যান্ড। বরফে ঢাকা এই বিশাল ভূখণ্ডটি এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ডেনমার্কের অধীনে থাকা এই অঞ্চলটি দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এই দখলের পায়তারা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি গ্রীনল্যান্ড চান এবং যেভাবেই হোক সেটা নেবেন। এই ঘোষণা শুনে প্রথমে অনেকেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। ভেবেছিল এটা হয়তো ট্রাম্পের আরেকটি উদ্ভট বক্তব্য। কিন্তু যখন বাস্তবে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হলো তখন হাসি থেমে গেল। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল গোটা ইউরোপে।
সম্প্রতি গ্রীনল্যান্ডে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপের আটটি দেশ কথিতভাবে গ্রীনল্যান্ডকে রক্ষা করার জন্য সেখানে সেনা প্রেরণ করেছে। এই আটটি দেশ কিন্তু সাধারণ কোনো দেশ নয়। এদের নাম শুনলেই বোঝা যায় এরা কতটা শক্তিশালী। নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ড এবং ফিনল্যান্ড। ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই দেশগুলো একসাথে সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্রীনল্যান্ডে উপস্থিতি জানান দিতে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট। আমেরিকাকে বুঝিয়ে দেওয়া যে এটা এত সহজে হবে না।
কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। এই আট দেশের এই পদক্ষেপে তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। এবং প্রতিশোধ নিলেন তার নিজস্ব স্টাইলে। এই আটটি দেশের উপর অতিরিক্ত দশ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলো। শুধু শুল্ক নয়, সাথে এলো হুমকিও। স্পষ্ট করে বলা হলো যদি এরা আবার গ্রীনল্যান্ড দখলে কোনো বাধা দেয় তাহলে এই দেশগুলোকে অনিরাপদ করে দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের যে সামরিক ঘাঁটিগুলো এই দেশগুলোতে রয়েছে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে। মানে পরিষ্কার বার্তা। হয় আমাদের সাথে থাকো নয়তো নিজেদের দেখে নাও।
পরিস্থিতি এখন উত্তপ্ত থেকে উত্তপ্ততর হচ্ছে প্রতিটি দিন। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম পলিটিকো এমন একটি খবর প্রকাশ করেছে যা পড়লে বোঝা যায় পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা একত্রে বৈঠকে বসেছেন। তারা আলোচনা করছেন কীভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই প্রতিশোধমূলক সিদ্ধান্তের জবাব দেওয়া যায়। এবং তারা একটি পাল্টা পদক্ষেপের কথা ভাবছেন। সেই পদক্ষেপটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের উপর তিরানব্বই বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা। হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন। তিরানব্বই বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অংকের শুল্ক আরোপ করে তারা আমেরিকাকে চাপে ফেলতে চাইছেন।
কিন্তু এই সব কিছুর মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা হলো জাতিসংঘের মুখ খোলা। এতদিন জাতিসংঘ চুপ ছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অবশেষে সংবাদ সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি যা বলেছেন তা শুনলে রীতিমতো শিউরে উঠতে হয়। তিনি বলেছেন আন্তর্জাতিক যত ধরনের আইন রয়েছে সব আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কোনো কিছুকেই তারা তোয়াক্কা করছে না। আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী আইনের শাসন যে ছিল সেটা এখন ধ্বংসের মুখে।
তবে জাতিসংঘ নিজেও যে কতটা অসহায় সেটা বুঝতে বেশি সময় লাগে না। কারণ জাতিসংঘের সদর দপ্তর কোথায়? নিউইয়র্কে। মানে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। যেকোনো মুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলে জাতিসংঘের সকল কর্মকর্তার ভিসা বাতিল করে বলে দিতে পারেন আজ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যান। জাতিসংঘ বন্ধ। এই আশঙ্কা এখন আর কল্পনা নয়। এটা একটা বাস্তব সম্ভাবনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপের দেশগুলোকে একটা ডেডলাইন দিয়ে রেখেছেন। আগামী জুন মাস। এই জুন মাসের মধ্যে যদি গ্রীনল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করা না হয় তাহলে ইউরোপের সকল দেশের উপর পঁচিশ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসবে। কেউ রেহাই পাবে না। এই ঘোষণা শুনে ইউরোপীয় নেতারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তাদের সামনে এখন উভয় সংকট। গ্রীনল্যান্ড বিক্রি করলেও বিপদ। কারণ সেটা হবে নিজেদের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত। আর বিক্রি না করলে অর্থনৈতিক এবং সামরিক সংঘাতের বিপদ।
কিন্তু এই পুরো পরিস্থিতির পেছনে যে আসল খেলা চলছে সেটা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ছে না। অনেকে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্র গ্রীনল্যান্ড দখল করতে চাইছে সেখানে সামরিক ঘাঁটি বানাতে বা সেখানকার তেল এবং প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করতে। কিন্তু আসল কারণটা অনেক গভীর এবং অনেক বেশি ভয়ংকর।
গ্রীনল্যান্ড দখলের মূল উদ্দেশ্য হলো ডলারের কৃত্রিম চাহিদা অব্যাহত রাখা। বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলা দরকার। ধরুন গ্রীনল্যান্ডের মূল্য নির্ধারণ করা হলো এক থেকে দেড় ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি এটা কেনে তাহলে তারা কীভাবে এই টাকা দেবে? সোনা দিয়ে? না। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটা কোনো চিন্তার বিষয় না। তাদের আছে ডলার ছাপানোর মেশিন। তারা শুধু অর্ডার দেবে। ডলার ছাপা হয়ে যাবে। এই দেড় ট্রিলিয়ন ডলার ইউরোপের দেশগুলোকে দিয়ে দেওয়া হবে।
এখন এই ডলারগুলো ইউরোপের প্রতিটি দেশ ভাগ করে নেবে। কিন্তু তাদের নিজেদের মুদ্রা তো ইউরো। তাহলে এই ডলারগুলো তাদের অর্থনীতিতে ঢোকাতে হলে তাদের ইউরো সাপ্লাই করতে হবে। মানে পরিষ্কারভাবে ডলারের কৃত্রিম চাহিদা গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে যাবে। এই দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের যে প্রভাব সেটা আগামী অন্তত পঁচিশ বছর ইউরোপকে বাধ্য করবে ডলারকে বিশ্বের এক নম্বর মুদ্রা হিসেবে মেনে নিতে। তারা চাইলেও এই জাল থেকে বের হতে পারবে না।
এটাই হলো আমেরিকার আসল খেলা। বিভিন্ন দেশ দখল করা, খনি দখল করা, এগুলো কিন্তু সেই সম্পদ ব্যবহার করার জন্য নয়। কারণ সেই সম্পদ উত্তোলন করা ব্যয়বহুল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রোডাকশন ক্ষমতাও নেই। তবে ডলার বিক্রি করে বা ডলারের কৃত্রিম চাহিদার মাধ্যমে বিনা পরিশ্রমে অর্থ উপার্জন করা অনেক সহজ। এটাই তাদের মূল কৌশল।
এখন প্রশ্ন হলো ইউরোপ কি সত্যিই এত দুর্বল? তারা কি পারছে না যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকাতে? ইউরোপকে বলা হয় চতুর্থ সুপারপাওয়ার। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীনের পরে তাদের অবস্থান। প্রায় বত্রিশটি দেশ একত্রে বিশাল সামরিক শক্তি। অর্থনীতির আকারও বিশাল। সম্মিলিত সামরিক শক্তিও কম নয়। তাহলে এই বিশাল শক্তি কেন গ্রীনল্যান্ড রক্ষা করতে পারছে না? কেন তারা জরুরি ভিত্তিতে ওয়াশিংটনে যাচ্ছে ট্রাম্পের হাত ধরে অনুরোধ করতে যে দয়া করে জোর করে আমাদের ভূখণ্ড নিয়ে যাবেন না?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে একটা তিক্ত সত্যে। ইউরোপের সামরিক শক্তি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রে সজ্জিত। তাদের যুদ্ধবিমান আমেরিকান। তাদের ট্যাংক, মিসাইল, সব কিছুতে আমেরিকান প্রযুক্তি। এখন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব নয়। বিকল্প অস্ত্র তৈরি করতে হবে। কিন্তু সেটা করতে সময় লাগবে চার থেকে পাঁচ বছর।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের নেতারা একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্তের কথা ভাবছেন। তারা আলোচনা করছেন কীভাবে ইরানের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া যায়। হ্যাঁ, সেই ইরান যাকে এতদিন তারা শত্রু ভাবতো। এখন তারা চাইছে ইরান আরো শক্তিশালী হোক এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যস্ত রাখুক।
ইরান একটি আঞ্চলিক শক্তি হয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে যেভাবে মোকাবেলা করছে সেটা ইউরোপের জন্য শিক্ষণীয়। পারস্য উপসাগরে তিনটি ছোট দ্বীপ আবু মুসা, গ্রেটার তুনব এবং লেসার তুনব। এই দ্বীপগুলো নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে বিরোধ চলেছে। কিন্তু এক ইঞ্চি জায়গাও যুক্তরাষ্ট্র দখল করতে পারেনি। অথচ ইউরোপের এই বিশাল শক্তি গ্রীনল্যান্ডের মতো বড় ভূখণ্ড রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে।
ইউরোপ এখন চাইছে ইরান যদি শক্তিশালী হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখে তাহলে ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ড ছেড়ে ইরান নিয়ে মাথা ঘামাবে। সেই সময়টা ইউরোপ কাজে লাগাবে নিজেদের সামরিক শক্তি গড়ে তুলতে। এটা একটা কৌশলগত খেলা।
এখন দেখার বিষয় এই কৌশলের খেলায় কে জিতবে। যুক্তরাষ্ট্র না ইউরোপ? নাকি ইরানের মতো তৃতীয় কোনো শক্তি এই সুযোগের সঠিক ব্যবহার করে নিজেকে আরো শক্তিশালী করে তুলবে? আগামী কয়েক মাস বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক নাটকীয় পরিবর্তন আসতে পারে। সেই পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে আমাদের মতো ছোট দেশগুলোতেও। কারণ হাতিদের লড়াইয়ে পায়ের তলায় পিষ্ট হয় ঘাস। আর সেই ঘাসের জায়গায় আছি আমরা।