লাইসেন্স ও মেয়াদবিহীন ইটভাটায় নৈরাজ্য–মহোৎসব
জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে দেখাচ্ছে বৃদ্ধাঙ্গুলি
পাবনার বিভিন্ন উপজেলায় ইটভাটাগুলো যেন আইন-শৃঙ্খলার বাইরে একটি আলাদা রাজ্য। গাছ কাটার শক্তিশালী মেশিন বসিয়ে রাতদিন নির্বিচারে কাটা হচ্ছে সবুজ বৃক্ষ। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কাঁচা কাঠ, কৃষিজমির উর্বর মাটি ও বিভিন্ন নিষিদ্ধ জ্বালানিও। আইন আছে, নিয়ম আছে—কিন্তু বাস্তবে নেই কোনো প্রয়োগ। ফলে জেলা জুড়ে পরিবেশ ধ্বংসের উৎসব চলছে প্রকাশ্যেই।
লাইসেন্স–ছাড়পত্র কিছুই নেই: তারপরও ভাটায় আগুন জ্বলছে
সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী—কোনো ইটভাটা চালাতে পরিবেশ ছাড়পত্র, ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন, চিমনি প্রযুক্তি, সাইট নির্বাচন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ—এসব বাধ্যতামূলক।
কিন্তু সরেজমিনে পাবনা সদর উপজেলার চরভগিরাতপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়—
অধিকাংশ ভাটার নেই লাইসেন্স,
যাদের রয়েছে তাদেরও নবায়ন বহু বছর ধরে বন্ধ,
পরিবেশ ছাড়পত্র নেই প্রায় কোনও ভাটারই,
নদীতীর, কৃষিজমি ও জনবসতির পাশেই স্থাপিত ভাটা।
স্থানীয়রা জানায়, ভ্রাম্যমান আদালতের জরিমানা মানেই ভাটার মালিকদের কাছে “তুচ্ছো চাঁদা” — আর কয়েক দিনের মধ্যে আবার ভাটা চালু।
সমিতি গঠন করে অন্যায় ঢাকার চেষ্টা, সিন্ডিকেটে বাড়ছে ইটের দাম।
অবৈধ কাজকে বৈধতা দিতে কিছু ভাটা মালিক সমিতি বা সংগঠন গঠন করছে। সমিতির নাম ব্যবহার করে তারা প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
এছাড়া বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ইটের দাম নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
ফলে সাধারণ মানুষ, ঠিকাদার ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ বাড়ছে।
ভাটার পাশে স্তূপ করে রাখা কাটা কাঠ দেখে সহজেই বুঝা যায়—এ এলাকায় প্রতিদিন কতো গাছ অদৃশ্য হচ্ছে।
এছাড়া ফসলি জমির উপরের উর্বর মাটি কেটে নেওয়ায় জমি অনুর্বর হয়ে পড়ছে,
ধোঁয়া এবং ছাইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবজি ও ধানক্ষেত,
বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখের জ্বালা—শিশু ও বৃদ্ধদের ভোগান্তি তীব্র।
পরিবেশবিদদের মতে, বায়ুদূষণের এক বড় উৎস হলো ইটভাটার কালো ধোঁয়া।
প্রকৃত চিত্র বেশ ভীতিকর—জেলার দুই তৃতীয়াংশ ভাটাই অবৈধ।
সাম্প্রতিক জাতীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী—
দেশে প্রায় কাগজে কলমে ৮,৫০০ ইটভাটা উল্লেখ থাকলেও
এর মধ্যে অর্ধেকেরই নেই কোনো বৈধ ছাড়পত্র, আর এই তালিকার কয়েকগুণ বেশি রয়েছে চর এলাকার নদী পাড়ের অবৈধ ইটভাটা।
পার্শ্ববর্তী জেলা কুষ্টিয়ায় ২১৩ ভাটার মধ্যে ১৯৬টি অবৈধ।
অনেক ভাটা উচ্ছেদের পর আবার চালু হয় রাজনৈতিক/প্রভাবশালী চক্রের সহায়তায়।
এ বাস্তবতা দেখায়—পাবনার ঘটনা পৃথক কিছু নয়, বরং দেশের ইটভাটা খাতে সম্পূর্ণ একধরনের সিস্টেমেটিক নৈরাজ্য।
প্রশাসনের নীরবতা কখনওবা দায় এড়াতে কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত—প্রশ্নের মুখে সরকারি নীতি বাস্তবায়ন।
সরকার ঘোষণা দিয়েছে—নতুন ভাটার ছাড়পত্র দেওয়া হবে না এবং অনুমোদনহীন ভাটা বন্ধ করতে হবে।
কিন্তু জেলা পর্যায়ে সেই নীতির প্রতিফলন দুর্লভ।
পাবনার স্থানীয়রা অভিযোগ করেন—
“জরিমানা করে চলে গেলে ২-৩ দিনের মধ্যেই আগের মতো ভাটা চালু হয়। কেউ মনিটরিং করে না। আবার অভিযানে গেলে মালিকরা সমিতির ব্যানার দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করে।”
অবৈধ ভাটা সম্পূর্ণ উচ্ছেদ,
পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট বাধ্যতামূলক করা,
কৃষিজমি সুরক্ষায় মনিটরিং টিম,
গাছ পোড়ানো বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ,
বছরে কয়েকবার নয়—নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে বেশ কিছু ভাটার মালিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়ঃ ইটভাটার মালিকদের কয়েক কোটি টাকার ইনভেস্ট থাকে, হাজারও শ্রমিক ও ব্যবসায়ী জড়িত এ পেশায়। লাইসেন্স করেছি, পরিবেশ ছাড়পত্রও নিয়েছি, তবুও ভ্রাম্যমাণ আদালত এসে কোন না কোন অযুহাতে আমাদের জরিমানা করছেই। আমরা লাইসেন্স করে যে কষ্টে ইটভাটা চালাচ্ছি যাদের লাইসেন্স নাই তারাও আরও সুবিধা নিয়ে ভাটা চালাচ্ছে। তাহলে সরকারি নীতিমালা প্রয়োগ হলো কিভাবে? এজন্যই সবাইকে ম্যানেজ করেই ব্যবসা চলে। এতে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অনেকেই এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। আমাদের বাপ-দাদার ব্যবসা এটা, আমরা বৈধভাবেই করতে চাই কেননা এটাতো চুরি ডাকাতি বা মাদক ব্যবসা নয়।
আমরা সমিতি গঠন করেছি, একতাবদ্ধ হয়েছি লড়াই সংগ্রাম করে ব্যবসাটাকে টিকিয়ে রাখতে। এতো টাকা ইনভেস্ট করে, সরকারকে ভ্যাট ট্যাক্স দেই, জরিমানা, চাঁদা দেই তারপরেও কেন আমরা চোরের মত চলবো?
সাধারণ জনগণ এর সঠিক সুরাহা চায়। সুস্থ সুন্দর পরিবেশ এবং নিয়মনীতি মেনে ব্যবসার নিশ্চয়তা পেতে সরকারের কার্যকর ভুমিকা আশা করছে।